Views Bangladesh Logo

আখতার হুসেনকে নিয়ে মোরশেদ শফিউল হাসানের স্মৃতিচারণা

 VB  Desk

ভিবি ডেস্ক

মজার মজার ছড়া, মায়াময় গল্প আর উদ্দীপনাময় গানের মধ্য দিয়ে প্রায় ছয় দশক ধরে শিশুদের আনন্দের জগৎ নির্মাণ করেছেন আখতার হুসেন। সহজ, প্রাণবন্ত ও স্বাভাবিক ভাষার ছড়ায় তিনি একাধিক প্রজন্মের শৈশবকে রাঙিয়েছেন। তাঁর লেখা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; পাঠ্যপুস্তক, গান ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়েও ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের জীবনে।

সাংবাদিকতা ও প্রকাশনার পাশাপাশি তিনি যুক্ত ছিলেন ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর ও উদীচীর মতো প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর কলম হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার। ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা’ গানটি তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গেও স্মরণীয় করে রেখেছে।

শতাধিক গ্রন্থের এই স্রষ্টা বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ পেয়েছেন নানা সম্মাননা।

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণসহ নানা শারীরিক জটিলতায় তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ ও অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসেও ভুগছিলেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮১ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

এই গুণী কবি, ছড়াকার, শিশুসাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠককে নিয়ে প্রাবন্ধিক, সমালোচক, গবেষক ও কবি মোরশেদ শফিউল হাসান স্মৃতিচারণ করেছেন। আবেগঘন লেখাটি হুবুহু তুলে ধরা হলো:

মৃত্যুর পর কাউকে শহীদ মিনারে আনা হলে আখতার ভাই সেখানে ছুটে যেতেন। বলতেন, ‘মুখটা শেষবারের মতো দেখে আসি‌।’ কখনো ব্যতিক্রম ঘটেছে বলে মনে হয় না। এক‌ই কর্মস্থলে যখন তাঁর সহকর্মী ছিলাম আমাকে পীড়াপীড়ি করতেন সঙ্গে যাওয়ার জন্য। আমি যেতাম না।

জীবিত মানুষটার মুখচ্ছবিই স্মৃতিতে ধরে রাখতে চাই বলে আমি বাবা-বোন-ভাই কারো মরণোত্তর মুখ দেখিনি (মায়ের মৃত্যুর সময় দূরে ছিলাম)। বন্ধু বা অন্য পরিচিতজনদেরও নয়। আত্মীয়স্বজন বা অন্যরা ঠেলে ‘শেষ দেখা’ দেখতে নিয়ে গেলেও (এ বিষয়ে কী একটা শরিয়তি বিধান নাকি আছে, পুরুষ ও নারী ভেদে যা আলাদা), কাছে গিয়ে আমি প্রায় ক্ষেত্রে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি।

যে রকম ‘মুর্দা’ বা ‘লাশ’-এর মতো শব্দগুলোর ব্যবহারও আমি সাধারণত এড়িয়ে যাই। শহীদ মিনার বা জানাজায় গেলেও নিষ্প্রাণ মানুষটির মুখদর্শন আমি করি না।

কিন্তু আখতার ভাই, এমনকি তাঁর অসুস্থ শরীর নিয়েও, বাসে বা রিকশায় চড়ে শহীদ মিনারে ছুটে যেতেন। শুনেছি একটু বেশি সময় নিয়ে চেনা মানুষটির মুখ দেখতেন। তারপর ফিরে এসে বর্ণনা ও স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠতেন। অনেক সময় একাই তিনি টেবিলে মাথা রেখে কাঁদতেন। কতবার এমন দেখেছি।

কিন্তু না, আমি তাঁর অশ্রুসিক্ত সে মুখটিও নয়, শিশুর সারল্যমাখা হাস্যোজ্জ্বল মুখটিই স্মরণে রাখতে চাই‌। যে কারণে আজও আমি শহীদ মিনারে তাঁকে শেষ দেখা দেখতে যেতে পারিনি, বা আসলে চাইনি। ক্ষমা করবেন, আখতার ভাই! যদিও আমি আপনাকে ক্ষমা করতে পারছি না। আমাদের অনেক কথা, আপনার অনেক কাজ যে বাকি রয়ে গেল! আমি আপনাকে প্রায়ই ব‌ই কেনার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে বলতাম। বয়সে আপনার ছোট হয়েও, এ নিয়েও আপনাকে রীতিমতো বকাবকি করেছি।

বলেছি, ‘যখন থাকবেন না তখন এসব বইপত্রের কী হবে? আপনার তো নিজের বাসাও নেই, ভাড়া বাড়িতে থাকেন।' আপনার একটি আকাঙ্ক্ষা (প্রায়ই যা আমাকে বলতেন) হয়তো পূর্ণ হতে যাচ্ছে : প্রিয়তমা পত্নীর পাশে আজ আপনার শেষশয্যা রচিত হবে। কিন্তু অনেক পুরানো, দুর্লভ ও দুর্মূল্য ব‌ই ও পত্রিকা নিয়ে আপনার যে বিরাট সৎগ্রহ (আমার অবশ্য কখনো দেখার সৌভাগ্য হয়নি) তা দিয়ে নিজের বাড়ির এলাকায় যে-একটি লাইব্রেরি গড়ার স্বপ্নের কথাও আপনি প্রায়ই বলতেন (আমাকে, এবং নিশ্চয় আর‌ও অনেককে) তার কী হবে?

কেউ কি এগিয়ে আসবেন? আপনার উত্তরাধিকারীরা, কিংবা ভক্ত-অনুরাগী-শুভার্থীদের কেউ?

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ