পাবনায় চাঁদের আলো আর কুপি বাতিতে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পুঁথি পাঠের আসর
গ্রামের রাত এখন আর আগের মতো গল্পে ভরে ওঠে না। উঠোনে মাদুর পেতে একসঙ্গে বসে দূর-দূরান্তের কাহিনি শোনার দিনও যেন হারিয়ে গেছে। মোবাইলের পর্দা আর আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে গায়েনের কণ্ঠে পুঁথি শোনার সেই অভ্যাস এখন অনেকটাই স্মৃতি। তবে পাবনার একটি গ্রামে বৃহস্পতিবারের রাতটি ছিল ব্যতিক্রম। কয়েক ঘণ্টার জন্য সেখানে যেন সময় থমকে দাঁড়িয়েছিল।
চাঁদের আলোয় ভেসে থাকা উঠোন। এক পাশে খড়ের পালা, অন্য পাশে ছোট্ট আয়োজন। চারদিকে কুপি আর হারিকেনের আলো। মাদুর পেতে বসেছেন গ্রামের মানুষ। কেউ এসেছেন পুরোনো দিনের স্মৃতি নিয়ে, কেউ আবার কৌতূহল থেকে—পুঁথি পাঠ আসলে কেমন হয়, তা দেখতে। এরপর যখন গায়েনের কণ্ঠে গল্প শুরু হলো, তখন সেই উঠোনে তৈরি হলো কয়েক দশক আগের গ্রামবাংলার এক পরিচিত আবহ।
পাবনার চাটমোহর উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের সোনাহারপাড়া গ্রামের প্রয়াত কিতাব প্রামাণিকের বাড়িতে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে বসেছিল এই পুঁথি পাঠের আসর। লোকজ সংস্কৃতির প্রায় হারিয়ে যাওয়া এই চর্চাকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই আয়োজন করা হয় অনুষ্ঠানটির।
চাটমোহর উপজেলা সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার উত্তরে চলনবিলের পাড়ে সোনাহারপাড়া। গ্রামের পথে ঢুকতেই শহুরে কোলাহল পেছনে পড়ে যায়। জারদিস মোড় থেকে মান্নানগর পর্যন্ত ভাঙাচোরা ও ধুলোমাখা পথ পেরিয়ে ইট বিছানো রাস্তা ধরে পৌঁছাতে হয় সেখানে। রাত সাড়ে ৮টার দিকে আয়োজনস্থলে দেখা যায়, ভ্যাপসা গরমের মধ্যেও একে একে মানুষ আসছেন। উঠোনে প্রস্তুতি নিচ্ছেন আয়োজকেরা। আর আকাশে তখন পূর্ণিমার চাঁদ।
রাত সোয়া ৯টার দিকে শুরু হয় মূল আয়োজন। তার আগেই নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতিতে ভরে ওঠে উঠোন। স্থানীয় দর্শকের পাশাপাশি ঢাকা থেকেও কয়েকজন সংস্কৃতিপ্রেমী ছুটে এসেছিলেন এই বিরল আয়োজন দেখতে।
বিপ্লব আচার্যের সঞ্চালনায় শুরুতে আয়োজনের মুখবন্ধ পাঠ করেন আয়োজক ডা. আতিকুর রহমান আতিক। এরপর একে একে শুরু হয় পুঁথি পাঠ। ‘বিবি সোনাভান’ পাঠ করেন নব্বইয়ের দশকের নাট্যজন ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান দুলাল। পরে ‘গাজী কালু ও চম্পাবতী’ পাঠ করেন লইমুদ্দিন প্রামাণিক। পাঠ শেষে দুই গায়েনকে সম্মাননা ক্রেস্ট দেওয়া হয়।
পুঁথির কাহিনি এগোতে থাকে, আর শ্রোতারা ডুবে যান সেই গল্পের ভেতর। কারও কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে শৈশবের স্মৃতি, কারও কাছে খুলে যায় একেবারে নতুন একটি সাংস্কৃতিক জগৎ। জ্যোৎস্নার আলো আর গায়েনের কণ্ঠ মিলিয়ে উঠোনের পরিবেশটিও হয়ে ওঠে অন্য রকম। মনে হয়, বিনোদনের জন্য মানুষকে সব সময় পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না—একটি গল্পও মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় ধরে রাখতে পারে।
সত্তরোর্ধ্ব কৃষক হাসান প্রামাণিকের কাছে অবশ্য এই আয়োজন নতুন কিছু নয়। তার স্মৃতিতে এখনো রয়ে গেছে চার দশক আগের সেই রাতগুলো। তিনি জানান, প্রায় ৪০ বছর আগে গ্রামে নিয়মিত পুঁথি পাঠের আসর বসত। কৃষিকাজ শেষ করে অবসর সময়ে মুরুব্বিদের সঙ্গে তিনিও সেখানে বসতেন। বহু বছর পর আবার সেই পরিবেশ দেখতে পেয়ে তার ভালো লেগেছে।
অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ইমদাদুল হকও ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। তার শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে পুঁথি পাঠের সম্পর্ক পুরোনো। ছোটবেলায় নানাবাড়ির বৈঠকখানায় এ ধরনের আসর বসত বলে জানান তিনি। এত বছর পর আবার পুঁথি পাঠ দেখতে গিয়ে তার মনে হয়েছে, তিনি যেন নিজের শৈশবের কাছেই ফিরে গেছেন। তার মতে, মোবাইলনির্ভর জীবনের বাইরে দেশীয় সংস্কৃতির এমন আয়োজন নতুন প্রজন্মের জন্য প্রয়োজন।
তবে তরুণদের কাছে অভিজ্ঞতাটি ছিল ভিন্ন। ফয়সাল মাহমুদ সদ্য জানান, পুঁথি পাঠ সম্পর্কে তার আগে তেমন কোনো ধারণাই ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আয়োজনের খবর দেখে তিনি আয়োজকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে বাবার সঙ্গে আসরে এসে প্রথমবারের মতো পুঁথি পাঠ শোনেন। নতুন প্রজন্মের এমন দর্শকরাই হয়তো জানান দেয়, হারিয়ে যাওয়া কোনো ঐতিহ্য পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি; সুযোগ পেলে তার প্রতি আগ্রহ এখনো তৈরি হতে পারে।
চাটমোহর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান টুকুন মনে করেন, পুঁথি পাঠ শুধু পুরোনো দিনের বিনোদন নয়, এটি বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ। তার ভাষ্য, পৃথিবী যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন শত শত বছরের পুরোনো একটি লোকজ ঐতিহ্যকে এভাবে সামনে আনা নিঃসন্দেহে বিরল ঘটনা। এই সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে সরকারি পর্যায়েও উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
এদিন নিজের কণ্ঠে পুঁথি পাঠ করে আবেগাপ্লুত হন নাট্যজন আসাদুজ্জামান দুলাল। ছোটবেলায় গ্রামে পুঁথি শুনতে শুনতেই এর সুর তার ভেতরে জায়গা করে নিয়েছিল। পেশাদার পাঠক না হলেও এবার প্রথমবারের মতো নিজে পুঁথি পাঠ করার সুযোগ পান তিনি। তার মতে, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও একাত্মতার অনুভূতি তৈরিতে এমন লোকজ আয়োজনের গুরুত্ব রয়েছে। বর্তমান সময়ের গল্প নিয়ে নতুন পুঁথি তৈরি করা গেলে এই ধারাকে আবারও মানুষের কাছে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।
আয়োজক ডা. আতিকুর রহমান আতিকের উদ্যোগের পেছনেও ছিল সেই হারানো সময়কে নতুন করে দেখার আকাঙ্ক্ষা। তিনি বলেন, বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে পুঁথি পাঠের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ষোড়শ-সপ্তদশ শতক থেকে শুরু করে আশি-নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত বিভিন্নভাবে এই ধারা টিকে ছিল। এখন এটি প্রায় বিলুপ্তপ্রায়। নতুন প্রজন্মের অনেকেই পুঁথি পাঠের নাম শুনলেও এর আসল রূপ সম্পর্কে জানে না। তাই পুরোনো এই লোকজ সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়াই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
পুঁথি পাঠের খবর শুনে ঢাকা থেকে ছুটে আসেন পাঁচবার জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শব্দ প্রকৌশলী রিপন নাথ। তার চোখেও এটি ছিল ব্যতিক্রমী আয়োজন। তবে শুধু পুরোনো পুঁথি পুনরাবৃত্তি করে এই ধারাকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে নতুন গল্প তৈরি করতে হবে। তাহলে মানুষের আগ্রহ বাড়বে এবং পুঁথি পাঠ আবারও সাধারণ মানুষের বিনোদনের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
একসময় গ্রামবাংলার সন্ধ্যা ও রাত মানেই ছিল নানা আয়োজন। কোথাও যাত্রাপালা, কোথাও পুতুলনাচ, কোথাও সার্কাস; আবার কোনো উঠোনে বসত পুঁথি পাঠ কিংবা হাটুরে কবিতার আসর। মানুষ বিনোদনের পাশাপাশি এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে একে অন্যের কাছাকাছি আসত। সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের অবসর কাটানোর ধরন। আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন বিনোদনমাধ্যমের বিস্তারে সেই সম্মিলিত সংস্কৃতির অনেকটাই এখন হারিয়ে যাচ্ছে।
সোনাহারপাড়ার রাতটি তাই কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না। এটি ছিল হারিয়ে যেতে বসা এক সময়কে কয়েক ঘণ্টার জন্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। পূর্ণিমার আলো, কুপি-হারিকেনের মৃদু আলো আর গায়েনের কণ্ঠে গল্প—সব মিলিয়ে গ্রামের সেই উঠোনে তৈরি হয়েছিল এমন এক আবহ, যেখানে অতীত আর বর্তমানের দূরত্বটা কিছু সময়ের জন্য যেন মুছে গিয়েছিল।
মতামত দিন