Views Bangladesh Logo

রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই বিদায় রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের

বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই শুক্রবার (২৪ জুলাই) ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ছাত্রনেতা, মুক্তিযোদ্ধা, বিচারক, দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার এবং রাষ্ট্রপতি—বহু পরিচয়ের দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ অধ্যায়ে পর্দা নামল।

২০২৩ সালের এপ্রিলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তার সামনে বড় কোনো রাজনৈতিক সংকট ছিল না। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল বদলে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগ, জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পুরো সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে ছিলেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন এবং অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদকে শপথবাক্য পাঠ করান। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সেই সময়ে তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণের বিষয়।

তবে কয়েক মাস পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। শেখ হাসিনার পদত্যাগ বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র তিনি হাতে পাননি। এই বক্তব্যকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন তার পদত্যাগ দাবি করে। বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভও অনুষ্ঠিত হয়।

যদিও সাংবিধানিক জটিলতার কারণে অন্তর্বর্তী সরকার তাকে অপসারণের পথে যায়নি, তবু রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার কার্যক্রম ক্রমেই সীমিত হয়ে আসে। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া তার রাজনৈতিক ভূমিকা অনেকটাই আড়ালে চলে যায়।

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের আলোচনা আবারও সামনে আসে। শুরুতে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অবস্থান না জানালেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা জোরালো হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন।

সংবাদমাধ্যমকে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, "I am sick, so it is done." এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।

তবে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পরিচয় শুধু রাষ্ট্রপতিত্বেই সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৪৯ সালের ১০ ডিসেম্বর পাবনার শিবরামপুরে জন্ম নেওয়া সাহাবুদ্দিন ষাটের দশকের শেষদিকে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি পাবনা জেলা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন এবং ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতার পর যুবলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হলেও পরে বিচার বিভাগে যোগ দেন। ১৯৮২ সালে বিসিএস (বিচার) ক্যাডারে কর্মজীবন শুরু করে সহকারী জজ থেকে জেলা ও দায়রা জজ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সমন্বয়কারী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

২০১১ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান। পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের সময় তার ভূমিকা জাতীয়ভাবে আলোচিত হয়। বিচার বিভাগ থেকে অবসরের পর আবার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং দলটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হন তিনি।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার সময়কালকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম অংশ ছিল নিয়মিত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সময়। দ্বিতীয় অংশ ছিল ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরের অস্থির সময়, যখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে থেকে তাকে একের পর এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে এবং পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত ও বক্তব্য নিয়েই রাজনৈতিক বিতর্কের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন একটি সাংবিধানিক রূপান্তরের সময় দায়িত্ব পালনকারী রাষ্ট্রপ্রধান। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, তার কিছু সিদ্ধান্ত ও বক্তব্য রাজনৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মতভেদ থাকলেও সাম্প্রতিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন এমন একজন রাষ্ট্রপতি, যার মেয়াদ দেশের অন্যতম অস্থির রাজনৈতিক সময়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে থাকবে।

তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে শুধু একজন রাষ্ট্রপতির বিদায়ই নয়, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটল।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ