পুনঃতপশিলীকরণ নীতিমালার অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে
গত ১৮ নভেম্বর এক জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংবাদের প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে, ‘দুই গোষ্ঠীর ঋণ নিয়মিত, খেলাপি ঋণ কমলো ১২ শতাংশ।’ সংবাদটি দেশের শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাংক পিএলসি-সংক্রান্ত। প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম পড়ে বেশ আশান্বিত হয়ে উঠি। কারণ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাংক পিএলসি এক সময় দেশের সিডিউল ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ে ছিল; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই ব্যাংকটি নানা দুর্নীতি এবং অনিয়মের কারণে তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। তাই প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম দেখে আশান্বিত হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, যাক শেষ পর্যন্ত জনতা ব্যাংক হয়তো ঘুরে দাঁড়াতে চলেছে; কিন্তু সংবাদ পাঠ করার পর হতাশ হতে হলো। সংবাদের শিরোনামের মধ্যেই অসঙ্গতি রয়েছে। কারণ দুই গোষ্ঠীর ঋণ নিয়মিত করা হয়েছে তাদের ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণের মাধ্যমে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী বেক্সিমকো গ্রুপ এবং সাম্প্রতিক সময়ে নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপ। এই দুটি শিল্পগোষ্ঠী অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং তারা চাইলে যে কোনো পরিস্থিতিতে সুবিধা নিতে পারেন। এই দুটি উদ্যোক্তা গোষ্ঠী তাদের কাছে পাওনা প্রায় ১৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পুনঃতপশিলীকরণ করিয়ে নিয়েছে। মূলত এ কারণেই জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার মোট ছাড়কৃত ঋণের ৩০ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জনতা ব্যাংক লিমিটেড পিএলসিকে তাদের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার জন্য পরামর্শ দিয়েছে; কিন্তু এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যাংকটি এখনো অনেকটাই পিছিয়ে আছে। এই বৃহৎ ঋণ খেলাপি দুটি গোষ্ঠী তাদের ঋণ হিসেব পুনঃতপশিলীকরণ করিয়ে নেয়ার ফলে ব্যাংকের আর্থিক স্বার্থ অনেকটাই উন্নত হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে; কিন্তু এই উন্নতি হয়েছে কৃত্রিমভাবে। জনতা ব্যাংক যদি ঋণের কিস্তি আদায়ের মাধ্যমে তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে পারতো তাহলে তারা বাহবা পেতে পারতো; কিন্তু তা হয়নি। বরং ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এবং অনুপাত কমিয়ে দেখানো হলো।
যারা ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত আছেন ঋণ গ্রহণ করে বা অন্য কোনো উপায়ে তারা ‘ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণ’ শব্দের সঙ্গে পরিচিত; কিন্তু যারা ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত নন তাদের অনেকের পক্ষেই ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণের মর্মার্থ অনুধাবন করা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই এ ব্যাপারে প্রাথমিক আলোচনা করা যেতে পারে। ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণ বা রিসিডিউলিং বলতে কোনো ঋণ হিসাবের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো বা কমানোকে বুঝায়। আমাদের দেশের বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণ বলতে সাধারণত ঋণের কিস্তি পরিশোধের নির্ধারিত সময় সীমা বর্ধিতকরণকেই বুঝায়। যেমন, কোনো গ্রাহকের গৃহীত ঋণের কিস্তি পরিশোধের নির্ধারিত সময় হয়তো ৩০ ডিসেম্বর। তিনি সেই ঋণের কিস্তি নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করতে না পারলে এক সময় তাকে ঋণ খেলাপি হিসেবে আখ্যায়িত বা চিহ্নিত করা হবে। কোনো ঋণ হিসাব খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত হলে সেই ঋণ হিসাবধারীকে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। তাই সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা বা ঋণ গ্রহীতা চেষ্টা করেন ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা বৃদ্ধি করতে। যদি ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড আবেদনকারীর ঋণ হিসাব নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পুনঃতপশিলীকরণ করে দেয় তাহলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেই উদ্যোক্তার ঋণ হিসাবকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না।
আমাদের দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণ পদ্ধতির প্রয়োগ প্রথম শুরু হয় ১৯৯১ সলে। সেই সময় বিএনপি সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়ে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণের জন্য আবেদন করে। সেই সময় বিশ্বব্যাংক ঋণ খেলাপিদের তালিকা প্রকাশসহ তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের শর্ত দেয়। সেই শর্ত পরিপালনের জন্য একই বছর (১৯৯১) ২০ মে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে ১৭১ জন বৃহৎ ঋণ খেলাপির একটি তালিকা প্রকাশ করে। এই তালিকায় যারা স্থান পেয়েছিল সেই সব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট ব্যাংকিং সেক্টরের আড়াই কোটি টাকা থেকে তদূর্ধ্ব অঙ্কের খেলাপি ঋণ পাওনা ছিল। প্রথম তালিকা প্রকাশের পর এ ধরনের ঋণ আরও তালিকা প্রকাশের অঙ্গীকার করা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাংকের উদ্যোগে ঋণ খেলাপিদের প্রথম তালিকা প্রকাশের পর ঋণ খেলাপিরা বাংলাদেশ ব্যাংক তথা সরকারের ওপর প্রচণ্ড রকম ক্ষিপ্ত হয়। তারা সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতা করার হুমকি দেয়। এই অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ শতাংশ নগদ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়মিতকরণের সুযোগ দেয়া হয়। ১৯৯১ সালে ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণের যে আইন করা হয়েছিল তা ছিল আন্তর্জাতিক মানের; কিন্তু কয়েক বছর আগে ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণ-সংক্রান্ত নীতিমালা সহজীকরণ করা হয়েছে। আগে কোনো ঋণ হিসাব খেলাপি হয়ে পড়লে এককালিন ১০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ ডাউন পেমেন্ট ব্যাংকে জমা দিয়ে ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণের জন্য আবেদন জানানো যেত।
ঋণ হিসাব সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য পুনঃতপশিলীকরণ করা যেত। বর্তমানে যে নীতিমালা অনুসরণ করে ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণ করা হচ্ছে তাতে মাত্র ২ শতাংশ নগদ ডাউন পেমেন্ট ব্যাংকে জমা দিয়ে ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণের জন্য আবেদন করা যাচ্ছে। আবেদনকৃত ঋণ হিসাব এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য পুনঃতপশিলীকরণ করা যাচ্ছে। ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণ অর্থঋণের কিস্তি আদায় করা নয়। এটা হচ্ছে ঋণের কিস্তি প্রদান না করেও কোনো ঋণ গ্রহীতাকে নিয়মিত গ্রাহক হিসেবে দেখানোর একটি কৌশল মাত্র। ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণ অর্থ কোনোভাবেই পাওনা ঋণের কিস্তি আদায়ের নিশ্চয়তা প্রদান করে না। বাস্তবতা হচ্ছে ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণ করা হলে সেই ঋণ হিসাব থেকে কিস্তি আদায়ের সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে যায়। যারা সাম্প্রতিক সময়ে তাদের ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণ করেছে তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে আবারও ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছেন।
২০১৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অজুহাতে একটি শক্তিশালী মহল ৫০০ কোটি টাকা ও তদূর্ধ্ব অঙ্কের খেলাপি ঋণ হিসাব পুনর্গঠন করিয়ে নিয়েছেন। সেই সময় অজুহাত দেখানো হয়েছিল তারা রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাই এই সুযোগ দেয়া হলো; কিন্তু প্রশ্ন হলো, যারা ৫০০ কোটি টাকা বা তদূর্ধ্ব অঙ্কের ঋণ খেলাপি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে কি শুধু তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন? যারা ৪৯৯ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি তারা কি ক্ষতিগ্রস্ত হননি? এই সুযোগ দেয়া কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত হয়নি। আর সুযোগ দেয়া হলে তা সবার জন্য অবারিত করা উচিত ছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে বেশ কিছু আইনি সংস্কার সাধন করা হয়েছে। কিন্তু এসব আইনি সংস্কার প্রধানত মহল বিশেষের স্বার্থ সংরক্ষণ করেছে মাত্র। এসব আইনি সংস্কার দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের সার্বিক স্বার্থ সংরক্ষণ করেনি। যে দুটি শিল্প গোষ্ঠীর কথা বলা হয়েছে, তারা যদি পাওনা ঋণের কিস্তি পরিশোধের মাধ্যমে তাদের ঋণ হিসাব নিয়মিত করতেন তাহলে অবশ্যই তারা ধন্যবাদ পেতে পারতেন; কিন্তু তারা তা করেননি। বরং তারা ২ শতাংশ নগদ ডাউন পেমেন্ট প্রদানের সুবিধা গ্রহণ করে তাদের ঋণ হিসাব নিয়মিতকরণ করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, বেক্সিমকো গ্রুপ এই মুহূর্তে তাদের খেলাপি ঋণ পুনঃতপশিলীকরণের মাধ্যমে নিয়মিত দেখানোর উদ্যোগ কেন গ্রহণ করেছে? এই গ্রুপের একজন কর্ণধার সরকারের বেসরকারি বিনিয়োগ-সংক্রান্ত উপদেষ্টার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। তিনি আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবেন। কাজেই তাকে ঋণ হিসাব নিয়মিত দেখানোর কোনো বিকল্প ছিল না। তার ঋণ হিসাব যদি খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হতো তাহলে তিনি নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে পারতেন না। ২০১৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অজুহাতে দেয়া ৫০০ কোটি টাকা ও তদূর্ধ্ব অঙ্কের খেলাপি ঋণ হিসাব পুনর্গঠনের যে সুযোগ দেয়া হয়েছিল সেখানেও বেক্সিমকো গ্রুপ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণ নিয়ে যখন উদ্বেগের কোনো শেষ নেই ঠিক সেই অবস্থায় এসব প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীকে তাদের ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণের সুযোগ দেয়া হলে তা সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দেবে। আমরা কি আসলেই ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে চাই নাকি কৃত্রিমভাবে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে খেলাপি ঋণ আদায় প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করতে চাই? এ ব্যাপারে জাতীয় পর্যায়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং সেক্টরের বিষয়ে যেসব আইনি সংস্কার করা হয়েছে তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। যারা ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি তাদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। যারা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করে খেলাপি হয়েছেন। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছে করে ঋণের কিস্তি ফেরত দিচ্ছেন না তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া যাবে না। যারা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করে খেলাপি হয়েছেন তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল,বিশেষ করে ক্ষমতাসীন সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত। তারা জাতীয় নির্বাচনে অংশ করে থাকেন। যেনতেনভাবে তারা জাতীয় নির্বাচনের আগে নিজেদের ঋণ খেলাপিমুক্ত হিসেবে প্রদর্শন করে থাকেন। দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে প্রচলিত আইনই তাদের সেই সুযোগ করে দিয়েছে।
যারা জাতীয় নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবেন তাদের ক্ষেত্রে অন্তত এক বছর পূর্ব থেকেই ব্যাংকিং সেক্টরের ঋণ হিসাব পুনঃতপশিলীকরণ বন্ধ রাখা প্রয়োজন। যারা স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে অংশ নেবেন তাদের বেলায়ও একই ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। যারা নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবেন তারা যদি খেলাপি ঋণের কিস্তি এককালীন নগদে পরিশোধ করেন শুধু তাহলেই তাদের নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। যারা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে সেই ঋণের কিস্তি নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করেন না তারা নিশ্চয়ই ভালো মানুষ হতে পারেন না। এ ধরনের মানুষকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সুযোগ দেয়ার কোনো মানে থাকতে পারে না।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড ও অর্থনীতিবিষয়ক লেখক।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে