Views Bangladesh Logo

বাংলাদেশের দুধেও মাইক্রোপ্লাস্টিক, ৪১ নমুনাতেই মিলল দূষণের প্রমাণ: নতুন গবেষণায় উদ্বেগ

বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া কাঁচা দুধ, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত তরল ও গুঁড়া দুধ এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিস্তৃত উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা প্রতিটি নমুনায় ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পাওয়ার পর গবেষকেরা একে খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, দুধের ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় শিশুদের শরীরে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় বেশি পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে।

এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের একদল গবেষক। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ২০২৩-২৪ অর্থবছরের গবেষণা অনুদানের সহায়তায় সম্পন্ন হওয়া গবেষণাটির শিরোনাম ‘বাংলাদেশের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ: বৈশিষ্ট্য নিরূপণ, খাদ্যজনিত সংস্পর্শ ও ঝুঁকি মূল্যায়ন’।

গবেষকদের দাবি, বাংলাদেশের দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, খাদ্যের মাধ্যমে মানবদেহে এর প্রবেশ এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে এটিই দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক গবেষণা।

দেশের সাত অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয় নমুনা

গবেষণায় মোট ৪১টি নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ১৭টি কাঁচা দুধ, ১২টি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তরল ও গুঁড়া দুধ এবং ১২টি বিভিন্ন ধরনের দুগ্ধজাত পণ্য। কাঁচা দুধ সংগ্রহ করা হয় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, যশোর, ঝিনাইদহ ও মেহেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। অন্যদিকে ব্র্যান্ডের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য নেওয়া হয় বাজার ও সুপারশপ থেকে।

পরীক্ষাগারে আধুনিক অণুবীক্ষণ প্রযুক্তি এবং ফোরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড (এফটিআইআর) বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিটি নমুনায় থাকা প্লাস্টিক কণার গঠন, ধরন ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করা হয়।

সবচেয়ে বেশি দূষণ ব্র্যান্ডের দুধে

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ মিলিলিটার ব্র্যান্ডের দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ০৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। একই পরিমাণ কাঁচা দুধে গড়ে পাওয়া গেছে ৯৩ দশমিক ৩৯টি এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে ৭০ দশমিক ৮০টি কণা।

গবেষকদের মতে, কাঁচা দুধ সংগ্রহের পর থেকে কারখানায় পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং প্যাকেটজাত করার প্রতিটি ধাপে প্লাস্টিকের বিভিন্ন উপকরণের সংস্পর্শে আসার কারণেই ব্র্যান্ডের দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, শুধু প্লাস্টিকের বোতল বা মোড়ক নয়, উৎপাদন লাইনের পাইপ, ফিল্টার, যন্ত্রপাতি, প্লাস্টিকের গ্লাভস, কর্মীদের কৃত্রিম তন্তুর পোশাক এবং কারখানার বাতাস থেকেও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা দুধে মিশতে পারে। তবে কোন উৎস থেকে কত শতাংশ দূষণ হয়েছে, তা এই গবেষণায় আলাদাভাবে নির্ণয় করা হয়নি।

অধিকাংশ কণাই ছিল ফাইবার আকৃতির

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুধে পাওয়া অধিকাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক ছিল স্বচ্ছ রঙের, আঁশ বা ফাইবার আকৃতির এবং আকারে ২৫০ মাইক্রোমিটারের কম।

কাঁচা দুধে শনাক্ত হওয়া কণার প্রায় ৭৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং ব্র্যান্ডের দুধে প্রায় ৮২ দশমিক ৮৩ শতাংশই ছিল আঁশজাতীয়। গবেষকদের মতে, সিনথেটিক কাপড়, প্লাস্টিকের প্যাকেজিং, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি এবং উৎপাদন পরিবেশ থেকেই এসব কণার উৎপত্তি হতে পারে।

মিলেছে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক

গবেষণায় টেফলনজাত উপাদান, পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট (পিইটি), নাইলন-৬, পলিইথিলিন, পলিডাইমিথাইলসিলোক্সেন (পিডিএমএস), পলিফেনিলিন সালফাইড (পিপিএস), পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি), পলিপ্রোপিলিন এবং পলিস্টাইরিনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।

কাঁচা দুধে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে টেফলনজাত উপাদান ও পিইটি। অন্যদিকে ব্র্যান্ডের দুধে টেফলনজাত উপাদানের পাশাপাশি পিডিএমএস এবং পিইটির উপস্থিতি বেশি ছিল। দুগ্ধজাত খাদ্যপণ্যে তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে পিইটি, নাইলন-৬ ও পিপিএস।

শিশুদের জন্য ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি


গবেষকেরা বয়স, শরীরের ওজন এবং প্রতিদিনের দুধ গ্রহণের পরিমাণ বিবেচনায় খাদ্যের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের সম্ভাব্য হার বিশ্লেষণ করেছেন।

ফলাফলে দেখা যায়, ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য গ্রহণের হার সবচেয়ে বেশি। কারণ, শরীরের ওজন কম হলেও এ বয়সে শিশুদের দুধের ওপর নির্ভরতা তুলনামূলক বেশি থাকে। ফলে প্রতি কেজি ওজনের বিপরীতে তাদের শরীরে বেশি পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করতে পারে।

ঝুঁকি মূল্যায়নে কাঁচা দুধ এগিয়ে

গবেষণায় দূষণ সূচক, দূষণের চাপের সূচক এবং রাসায়নিক ঝুঁকি সূচকের ভিত্তিতে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে কাঁচা দুধকে উচ্চ ঝুঁকি, ব্র্যান্ডের দুধকে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত খাদ্যকে মাঝারি ঝুঁকির শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।

গবেষকদের ভাষ্য, কাঁচা দুধে মোট মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংখ্যা কম হলেও সেখানে শনাক্ত হওয়া কিছু প্লাস্টিক উপাদানের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সম্ভাব্য ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হিসেবে মূল্যায়িত হয়েছে। তবে তারা স্পষ্ট করেছেন, এই ঝুঁকি সূচক কোনো নির্দিষ্ট রোগের প্রমাণ নয়; বরং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়নের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।

আন্তর্জাতিকভাবেও বাড়ছে উদ্বেগ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ (ইএফএসএ) ইতোমধ্যে খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা পরিচালনা করছে।

এদিকে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস, গর্ভফুল এবং শরীরের অন্যান্য টিস্যুতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। যদিও মানবদেহে এসব কণার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে এখনো চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত আসেনি, তবুও বিষয়টিকে বিশ্বজুড়ে উদীয়মান জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

কী সুপারিশ করেছেন গবেষকেরা

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের দুগ্ধ শিল্পে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এজন্য তারা উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন ধাপে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, উন্নতমানের পরিশোধন ও ফিল্টারিং প্রযুক্তি চালু, কম প্লাস্টিক নির্গমনকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার, উৎপাদন পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছেন।

তাদের মতে, এ ধরনের গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নীতি, মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের গ্রহণযোগ্য সীমা নির্ধারণ এবং জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি চালুর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকেরা।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ