মেসির ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিকে বিধ্বস্ত আলজেরিয়া
রাত নামতে না নামতেই কানসাস সিটির আকাশ নীল-সাদায় ভরে গিয়েছিল। কানসাস সিটি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখনো হাজার হাজার মানুষ ঢুকছেন, আর ভিডিও বোর্ডে মেসির মুখ দেখানো মাত্রই স্টেডিয়াম জুড়ে উন্মাদনা শুরু হয়ে যাচ্ছে। ৭৬ হাজারের বেশি দর্শক জানতেন — আজ রাতটা অন্যরকম। কারণ আজ মেসির শেষ বিশ্বকাপের পর্দা উঠছে।
ইতিহাস ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছিল মাঠে নামার আগেই — মেসি এই বিশ্বকাপে ষষ্ঠবারের মতো মাঠে নামলেন, ফুটবল ইতিহাসে যা আর কেউ কখনো করেননি। ২০০৬ সালে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২৬-এ সেটার সমাপ্তি — এই ভার বুকে নিয়েই নীল-সাদা জার্সি গায়ে মাঠে হাঁটলেন ৩৮ বছরের এক কিংবদন্তি।
প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া। ১২ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা দলটি — রিয়াদ মাহরেজের নেতৃত্বে তারা কোনো চমক দেখাতে পারে কিনা, সেই প্রশ্ন ছিল। কিন্তু মেসির সামনে চমক দেখানোর সুযোগ আলজেরিয়া পায়নি।
ম্যাচের শুরুটা ছিল টানটান। আলজেরিয়ার ইব্রাহিম মাজা মাঝমাঠে দুর্দান্তভাবে বল ধরে চাইবিকে পাস দেন, চাইবি সুন্দর কার্লিং শটে গোলের কাছে পৌঁছেও যান — কিন্তু অফসাইডের কারণে সেটি বাতিল হয়। একইভাবে মেসিরও একটি গোল বাতিল হয় অফসাইডে। দুই দলই বুঝতে পারছিল — আজকের রাত সহজ নয়।
কিন্তু ১৭ মিনিটে সব হিসাব বদলে দিলেন মেসি। রদ্রিগো দে পল একটি নিখুঁত থ্রু বল বাড়িয়ে দেন আক্রমণের তৃতীয় অংশে। মেসি বলটা পান, মুহূর্তে ঘুরে যান, বাঁ পা তুলে দূর থেকে যে শটটা মারেন — সেটা গোলরক্ষক লুকা জিদানের আঙুল ছুঁয়ে গিয়ে পোস্টের ওপরের কোণে জালে আটকায়। স্টেডিয়াম ফেটে পড়ল।
এই গোলের মাধ্যমে মেসি পঞ্চম আলাদা বিশ্বকাপ সংস্করণে গোল করার রেকর্ডে রোনালদোর সমকক্ষ হলেন। হাফটাইম পর্যন্ত স্কোর ১-০।
বিরতির পর আলজেরিয়া মরিয়া হয়ে ওঠার চেষ্টা করে। কিন্তু আর্জেন্টিনার মধ্যমাঠ তাদের কোনো সুযোগই দিচ্ছিল না। ৬০ মিনিটে দ্বিতীয় গোলটা এলো একটু ভিন্নভাবে। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার দূর থেকে শট মারলে লুকা জিদান থামাতে পারেন কিন্তু বলটা তার হাত থেকে ছিটকে পড়ে — আর সঠিক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা মেসি সেটা গোলে পাঠিয়ে দেন। স্কোর ২-০।
হ্যাটট্রিকের পর মেসিকে মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ স্কালোনি, তার জায়গায় নামেন নিকোলাস ওতামেন্দি।কিন্তু তার আগে, ৭৬ মিনিটে, এলো সেই মুহূর্ত যার জন্য পুরো স্টেডিয়াম অপেক্ষা করছিল।
নিকোলাস গনসালেস দ্রুত কাউন্টারঅ্যাটাকে এগিয়ে গিয়ে একটা নিখুঁত পাস কাটিয়ে দেন মেসির দিকে। মেসি বলটা ধরেন, ১৮ গজের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের ক্লিনিক্যাল কার্লিং শটে বল গড়িয়ে যায় জালের ভেতর। কানসাস সিটি স্টেডিয়ামের বিশাল গ্যালারি মেসির সামনে মাথা নত করে।
ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায়
এই হ্যাটট্রিক মেসির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে প্রথম — এবং এর মাধ্যমে তিনি জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোজের সঙ্গে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ডে যৌথভাবে শীর্ষে উঠলেন। পাশাপাশি, বিশ্বকাপে ১১টি ভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে গোল করে একক রেকর্ডও এখন তার।
ম্যাচের আগে যারা ভেবেছিলেন মেসির হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির প্রভাব পড়বে — তাদের সব আশঙ্কা গুঁড়িয়ে দিয়ে মেসি প্রমাণ করলেন তিনি আগের মতোই ভয়ানক।
ম্যাচশেষে মিক্সড জোনে মেসি শুধু একটাই কথা বললেন — 'আমি শুধু উপভোগ করতে চাই প্রতিটা মুহূর্ত।' কারণ তিনি জানেন, এই বিশ্বকাপের প্রতিটা মুহূর্তই হয়তো শেষবারের।
কানসাস সিটি সেই রাতটা অনেকদিন মনে রাখবে। রাখতে বাধ্য।
মতামত দিন