দেশে বাড়ছে হাম আতঙ্ক: শিশুদের সুরক্ষায় যা জানা জরুরি
দেশজুড়ে শিশুদের মধ্যে হাম সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত দুই দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাম আক্রান্ত হয়ে ৪০ জনেরও বেশি শিশুর মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতেই লক্ষণ শনাক্ত করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশু দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে অবহেলা করলে নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা বা মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতা তৈরি হয়ে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
হাম বা মিজলস একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা কাশি, হাঁচি বা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে টিকা না নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এটি শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটিয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
কী লক্ষণ দেখলে বুঝবেন হাম হয়েছে?
চিকিৎসকদের মতে, হাম সাধারণত প্রথম ৩ থেকে ৫ দিনে কয়েকটি স্পষ্ট লক্ষণ দিয়ে শুরু হয়। যেমন—
উচ্চ জ্বর
কাশি
নাক দিয়ে পানি পড়া
চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও পানি পড়া
দুর্বলতা
এ সময় মুখের ভেতরে সাদা দানার মতো ছোট দাগ দেখা যেতে পারে, যাকে কপলিক স্পটস (Koplik spots) বলা হয়। এটি হামের অন্যতম বিশেষ লক্ষণ।
এরপর শুরু হয় র্যাশ ফেজ। সাধারণত কানের পেছন থেকে লালচে র্যাশ শুরু হয়ে মুখ, ঘাড়, বুক, পিঠ হয়ে পুরো শরীর ও হাত-পায়ে ছড়িয়ে পড়ে। র্যাশ ছড়িয়ে পড়ার সময় জ্বর আরও বেড়ে যেতে পারে।
জ্বর বেশি থাকলে কী করবেন?
জ্বর ও খাওয়া কমে গেলে শিশুর শরীরে দ্রুত পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। তাই—
পানি
ওআরএস
ডাবের পানি
অল্প অল্প করে বারবার খাওয়াতে হবে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাবার বন্ধ করা যাবে না। এতে শিশু আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। ভাত, সুজি, খিচুড়ি, স্যুপ, নরম ভাত বা তরল খাবার দিতে হবে।
জ্বর কমাতে বয়স ও ওজন অনুযায়ী প্যারাসিটামল দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি কুসুম গরম পানি দিয়ে শরীর মুছে দিলে আরাম পাওয়া যায়।
চোখ ও ত্বকের যত্ন
হামের সময় চোখ খুব সংবেদনশীল হয়ে যায়। তাই পরিষ্কার পানি বা স্যালাইন দিয়ে চোখ মুছে দিতে হবে। ঘরের আলো কম রাখা ভালো, যাতে শিশুর চোখে অস্বস্তি না হয়।
ত্বকে র্যাশ থাকলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং ধুলো বা ধোঁয়া থেকে দূরে রাখতে হবে।
ভিটামিন এ খুবই গুরুত্বপূর্ণ
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য ভিটামিন এ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। তবে এটি অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে দিতে হবে।
প্রস্তাবিত মাত্রা:
৬ মাসের কম: ৫০ হাজার IU
৬–১১ মাস: ১ লক্ষ IU
১ বছর বা তার বেশি: ২ লক্ষ IU
পরপর ২ দিন
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সিডিসি উভয়ই হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য এই সাপোর্টিভ চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছে।
যা কখনো করবেন না
খাবার বন্ধ করবেন না
পানি কম দেবেন না
নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন না
ধুলো বা ধোঁয়ার মধ্যে রাখবেন না
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত ভিটামিন এ দেবেন না
কারণ অতিরিক্ত ভিটামিন এ শরীরে বিষক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন?
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে—
শ্বাস নিতে কষ্ট
বাচ্চা খাচ্ছে না
ঝিমিয়ে যাচ্ছে
খিঁচুনি
জ্বর কমছে না
কানে ব্যথা বা পুঁজ
ডায়রিয়া বা বমি
কী কী জটিলতা হতে পারে?
হাম থেকে সবচেয়ে বেশি যে জটিলতাগুলো দেখা যায়—
নিউমোনিয়া (সবচেয়ে বিপজ্জনক)
ডায়রিয়া
কানের সংক্রমণ
মস্তিষ্কে সংক্রমণ (Encephalitis)
বিরল ক্ষেত্রে SSPE
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু মৃত্যুর প্রধান কারণ সাধারণত নিউমোনিয়া ও তীব্র পানিশূন্যতা।
প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এমএমআর টিকা।
সময়সূচি:
৯ মাস
১৫ মাস
এ ছাড়া আক্রান্ত শিশুকে অন্তত ৪ দিন আলাদা রাখতে হবে, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। টিকাই হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে