হাম: হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটেও বাঁচানো গেল না যমজ দুই শিশুকে
দুই ভাইয়ের বয়সের পার্থক্য ছিল মাত্র কয়েক মিনিট। জন্মের পর থেকে একসঙ্গেই বেড়ে উঠছিল তারা। একসঙ্গে ঘুমাত, একসঙ্গে খেলত, একসঙ্গে অসুস্থও হয়েছিল। কিন্তু পরিবারের কেউ কল্পনাও করেনি, জীবনের শেষ যাত্রাটাও তাদের এতটা কাছাকাছি সময়ে হবে। মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে হামে মারা গেছে এক বছর বয়সী যমজ দুই শিশু আবদুল্লাহ আল নোমান ও আবদুল্লাহ আল ফাহিম।
এই দুই শিশুকে ঘিরেই ছিল বাবা হারুনুর রশিদ ও মা ইসরাত জাহানের সংসারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা খেলনা, ছোট ছোট জামাকাপড় আর শিশুদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র এখনো সেই স্বপ্নের সাক্ষী হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু ঘরে নেই তাদের হাসি, কান্না কিংবা দৌড়ে বেড়ানোর শব্দ। আছে শুধু এক গভীর শূন্যতা, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের পূর্ব খৈয়াছড়া তাকিয়াপাড়া গ্রামের এই পরিবারটি গত তিন মাস ধরে লড়েছে এক অসম যুদ্ধে। সন্তানদের বাঁচাতে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের হাসপাতালগুলোতে ছুটেছেন বাবা-মা। চিকিৎসার জন্য ধারদেনা করেছেন, মানুষের কাছে সাহায্য চেয়েছেন, দিনের পর দিন হাসপাতালের বারান্দায় কাটিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মৃত্যুর কাছে হার মেনেছে দুই শিশু।
বৃহস্পতিবার সকালে হারুনুর রশিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকের ছাপ এখনো স্পষ্ট। বাড়ির উঠানে বসে আছেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। কেউ সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। ঘরের ভেতরে নীরবে বসে আছেন মা ইসরাত জাহান। চোখে-মুখে ক্লান্তি, বেদনা আর দীর্ঘদিনের নির্ঘুম রাতের ছাপ।
মাত্র এক বছর আগে এই পরিবারে এসেছিল দ্বিগুণ আনন্দ। গত বছরের ১৬ এপ্রিল জন্ম নেয় যমজ দুই সন্তান। বাবা-মা আদর করে নাম রাখেন আবদুল্লাহ আল ফাহিম ও আবদুল্লাহ আল নোমান। বড় বোনও দুই ভাইকে নিয়ে ছিল ভীষণ উচ্ছ্বসিত। পরিবারের সবার আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল তারা।
কিন্তু চলতি বছরের মার্চ মাসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে ফাহিম। শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসকেরা জানান, সে হামে আক্রান্ত হয়েছে। কয়েকদিন চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও বেশিদিন স্বাভাবিক থাকতে পারেনি। আবারও শুরু হয় শ্বাসকষ্ট ও শারীরিক জটিলতা।
এর কিছুদিন পর একই উপসর্গ দেখা দেয় নোমানের শরীরেও। তাকেও হাসপাতালে নিতে হয়। পরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেন, সেও হামে আক্রান্ত। এরপর শুরু হয় দুই শিশুকে বাঁচানোর জন্য পরিবারের নিরন্তর সংগ্রাম।
একদিকে হাসপাতালের বেড, অন্যদিকে ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যয়—সব মিলিয়ে দ্রুত ফুরিয়ে যেতে থাকে পরিবারের সঞ্চয়। সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী হারুনুর রশিদ স্থানীয় বাজারে একটি ছোট মুদিদোকান চালান। কিন্তু সন্তানদের চিকিৎসার কারণে গত কয়েক মাস তিনি দোকানে নিয়মিত বসতে পারেননি।
হারুনুর রশিদ বলেন, যেখানে শুনেছি ভালো চিকিৎসা পাওয়া যাবে, সেখানেই গেছি। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত মানুষ—সবার কাছে সাহায্য চেয়েছি। এনজিও থেকেও সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। ছেলেদের চিকিৎসার জন্য ছয় লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। এখন অনেক দেনা হয়ে গেছে। কিন্তু টাকা নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই। আফসোস শুধু ছেলেদের বাঁচাতে পারলাম না।
চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টার মধ্যেও গত ২২ মে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় নোমান। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই আরও বড় বিপর্যয় নেমে আসে পরিবারটিতে। নোমানের মৃত্যুর পর ফাহিমের অবস্থারও অবনতি হতে থাকে। উন্নত চিকিৎসার আশায় তাকে ঢাকায় নেওয়া হয়। পরে নারায়ণগঞ্জের একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত মঙ্গলবার তারও মৃত্যু হয়।
এক সন্তানের মৃত্যুর মাত্র ১২ দিনের মাথায় আরেক সন্তানের জানাজায় অংশ নিতে হয়েছে হারুনুর রশিদকে। এই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তিনি বলেন, ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। চার বোনের পর আমি পরিবারের একমাত্র ছেলে। অনেক কষ্ট করে সংসার গুছিয়েছি। আল্লাহ দুটি ছেলে দিয়েছিলেন। ভাবছিলাম ওদের মানুষ করব, পড়াশোনা শেখাব। কিন্তু এখন সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্তানদের চিকিৎসার জন্য হারুনুর রশিদ সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। অর্থকষ্টের মধ্যেও চিকিৎসা বন্ধ করেননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাগ্যের নির্মম পরিণতি মেনে নিতে হয়েছে পরিবারটিকে।
এখন এই বাড়িতে গেলে চোখে পড়ে না কোনো শিশুর ছুটোছুটি। শোনা যায় না খেলার শব্দ। শুধু স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে। আর রয়ে গেছে একজন বাবার দীর্ঘশ্বাস।
হারুনুর রশিদ বলেন, দেনা একদিন শোধ হয়ে যাবে। আবার কাজ করব, দোকান চালাব। কিন্তু আমার দুই ছেলেকে তো আর কোনোদিন ফিরে পাব না। এ কষ্ট নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে হবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে