ময়মনসিংহে ড্রামে মরদেহ: অন্তরঙ্গ ভিডিও করায় নিরঞ্জনকে হত্যার দাবি পুলিশের
ময়মনসিংহ নগরের বেগুনবাড়ী এলাকার স্লুইসগেটের পানিতে প্লাস্টিকের ড্রামের ভেতর বস্তাবন্দী অবস্থায় উদ্ধার হওয়া নিরঞ্জন ধরকে (৫৪) হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের কথা জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় শামীম মিয়া (৩৮) নামে একজনকে গাজীপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পিবিআইয়ের ভাষ্য, অন্তরঙ্গ ভিডিও ধারণ করে শামীমকে ব্ল্যাকমেল ও টাকা দাবি করায় ক্ষুব্ধ হয়ে নিরঞ্জনকে হত্যা করা হয়। রোববার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে পিবিআই ময়মনসিংহ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান পিবিআই ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান।
গ্রেপ্তার শামীম নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার কৃষ্টপুর গ্রামের জালাল মিয়ার ছেলে। তিনি ময়মনসিংহ নগরের গলগণ্ডা এলাকায় বসবাস করতেন। পিবিআই জানায়, শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে গাজীপুরের গাছা থানার বোর্ডবাজারের বটতলা এলাকার সরদার মার্কেট থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখানে শ্যালক মাসুদ রানার ভাড়া বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। হত্যাকাণ্ডের পর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে গাজীপুরে আত্মগোপন করেছিলেন শামীম।
পিবিআইয়ের ভাষ্য, শামীমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রোববার সকালে ময়মনসিংহ নগরের একটি ভাড়া বাসা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত শিল ও বঁটি উদ্ধার করা হয়েছে।
নিহত নিরঞ্জন ময়মনসিংহ নগরের স্টেডিয়াম এলাকায় স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। তিনি নগরের আঠারবাড়ি বিল্ডিং এলাকার একটি সোনার দোকানে কাজ করতেন। তাঁর চারটি অটোরিকশা ছিল, যেগুলো খাগডহর এলাকার একটি গ্যারেজে রাখা হতো।
পিবিআই বলছে, ওই গ্যারেজের ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করার সুবাদে শামীমের সঙ্গে নিরঞ্জনের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। প্রাথমিক তদন্ত ও গ্রেপ্তার শামীমকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে পিবিআই জানায়, শামীমের পরিবারের সদস্যরা বাসায় নিয়মিত না থাকায় তিনি প্রায়ই ভাড়া বাসায় নারী নিয়ে আসতেন। এক নারীর সঙ্গে তাঁর একটি অন্তরঙ্গ ভিডিও ধারণ করেছিলেন নিরঞ্জন। পরে ওই ভিডিও দেখিয়ে শামীমের কাছে প্রায়ই টাকা দাবি এবং বিষয়টি তাঁর পরিবারের সদস্যদের জানিয়ে দেওয়ার হুমকি দিতেন বলে পিবিআই জানিয়েছে। এভাবে ধাপে ধাপে নিরঞ্জন প্রায় দুই লাখ টাকা নিয়েছিলেন বলেও পিবিআইয়ের ভাষ্য।
পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় শামীমের ভাড়া বাসায় গিয়ে আবার টাকা দাবি করেন নিরঞ্জন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে শামীম ঘরে থাকা শিল দিয়ে নিরঞ্জনের মাথায় আঘাত করেন। পরে তাঁর মুখে কাপড় গুঁজে বঁটি দিয়ে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়। এতে নিরঞ্জনের মৃত্যু হয় বলে পিবিআইয়ের দাবি।
পিবিআই আরও জানায়, হত্যার পর মরদেহ একটি চটের বস্তায় ভরে দুই পাশ বেঁধে বড় একটি নীল রঙের চালের ড্রামের মধ্যে রাখা হয়। পরে ড্রামটি সরিয়ে নিতে হানিফ মিয়া নামের এক ইজিবাইকচালককে ডেকে আনেন শামীম। বাসার মালামাল সরানোর কথা বলে ড্রামটি ইজিবাইকে তোলা হয়। পরদিন রাতে একটি মিশুক দিয়ে ড্রামটি বেগুনবাড়ী স্লুইসগেটের পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।
এর আগে ২৩ সেপ্টেম্বর সকালে বেগুনবাড়ী স্লুইসগেটের পানিতে ড্রামটি ভাসতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশকে খবর দেন। পরে ড্রামের ভেতর থেকে বস্তাবন্দী এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রথমে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। পরে মরদেহের সঙ্গে থাকা প্যান্টের পকেট থেকে ময়মনসিংহ হিন্দু কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেডের একটি টোকেন পাওয়া যায়। ওই টোকেনের সূত্র ধরে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী সবিতা রানী ধর ২৬ সেপ্টেম্বর বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন।
পিবিআই ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, ঘটনার পরপরই তাঁরা ছায়া তদন্ত শুরু করেন। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রধান সন্দেহভাজন শামীমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তির সঙ্গে কারা ঘনিষ্ঠ ছিলেন, সেই সূত্র ধরে তদন্ত করতে গিয়ে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়। শামীমকে রোববার আদালতে সোপর্দ করা হবে। এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
মতামত দিন