ঘরে কন্যাসন্তান থাকলে নারী কর্মী নিয়োগে বেশি আগ্রহী হন পুরুষ সিইওরা: গবেষণা
একজন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর সিদ্ধান্তে সাধারণত ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, বাজার পরিস্থিতি, পরিচালনা পর্ষদ ও প্রতিষ্ঠানের নীতিই বড় ভূমিকা রাখে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, এর বাইরে ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতাও কখনো কখনো কর্মক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে পুরুষ সিইও বা ব্যবস্থাপকদের ঘরে কন্যাসন্তান থাকলে প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীদের নিয়োগ ও সুযোগ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়।
২০১৭ সালে জার্নাল অব ফাইন্যান্সিয়াল ইকোনমিকসে প্রকাশিত ‘শেপড বাই দেয়ার ডটার্স: এক্সিকিউটিভস, ফিমেল সোশালাইজেশন, অ্যান্ড করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি’ শীর্ষক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে আসে। গবেষক হেনরিক ক্রনকভিস্ট ও ফ্রাঙ্ক ইউ ১৯৯২ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় প্রকাশ্যভাবে লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর সিইওদের তথ্য বিশ্লেষণ করেন।
গবেষণায় দেখা যায়, কোনো পুরুষ ব্যবস্থাপকের প্রথম কন্যাসন্তানের জন্মের পর তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারী কর্মীদের তুলনামূলক আয় গড়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটিতে নারী কর্মীদের নিয়োগ বা কর্মসংস্থানের হারও প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কন্যাসন্তান থাকা সিইওদের নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কার্যক্রমের মানও তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেছে। গবেষকদের হিসাবে, এসব প্রতিষ্ঠানের সিএসআর রেটিং গড় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় প্রায় ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেশি ছিল। কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্য, পরিবেশগত নীতি এবং কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কের মতো ক্ষেত্রগুলোতে এই পার্থক্য বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, কন্যাসন্তান থাকা সিইওদের নেতৃত্বাধীন মধ্যম সারির কোম্পানিগুলো সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচিতে বার্ষিক নিট আয়ের প্রায় ১০ দশমিক ৪ শতাংশ অতিরিক্ত ব্যয় করে থাকে।
গবেষকেরা এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে ‘ফিমেল সোশালাইজেশন’ বা নারীকেন্দ্রিক সামাজিকীকরণের ধারণা তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, সন্তান যেমন বাবা-মায়ের কাছ থেকে মূল্যবোধ ও আচরণ শেখে, তেমনি সন্তানকে বড় করতে গিয়ে বাবা-মায়ের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
একজন বাবা কন্যাসন্তানকে বড় করার সময় নারীর জীবন, সুযোগ ও সীমাবদ্ধতার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। সমাজে নারী-পুরুষের বৈষম্য, কর্মক্ষেত্রে নারীর সুযোগ কিংবা নারীদের সামনে থাকা বিভিন্ন বাধা তখন তার কাছে শুধু কোনো পরিসংখ্যান বা নীতিগত বিষয় হিসেবে থাকে না; পারিবারিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও সেগুলো সামনে আসে। গবেষকদের মতে, এর প্রভাব একজন নির্বাহীর কর্মক্ষেত্রের সিদ্ধান্তেও পড়তে পারে।
তবে গবেষকেরা এটিকে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে দেখেননি। গবেষণাটি ছিল পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য বিশ্লেষণ। ফলে কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়ার কারণেই কোনো সিইও নারী কর্মীদের জন্য বেশি সুযোগ তৈরি করেছেন—এমন নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
একটি প্রতিষ্ঠানের নীতি ও সিদ্ধান্তের পেছনে পরিচালনা পর্ষদ, শেয়ারহোল্ডারদের প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারি নীতি এবং নির্বাহীর নিজস্ব মূল্যবোধসহ অনেক বিষয় কাজ করে। তাই কন্যাসন্তান থাকা করপোরেট সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের একমাত্র কারণ—এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
তবু গবেষণার ফলাফলটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় সামনে আনে। মানুষের পেশাগত সিদ্ধান্ত শুধু কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকেই তৈরি হয় না; ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক অভিজ্ঞতাও কখনো কখনো সেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। একটি কন্যাসন্তানকে বড় করার অভিজ্ঞতা একজন বাবার কাছে নারীর জীবন ও কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতাকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করতে পারে—আর সেই পরিবর্তনের ছাপ কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নীতিতেও দেখা যেতে পারে।
মতামত দিন