Views Bangladesh Logo

শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমী আজ

ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছে সারাদেশের পূজামণ্ডপ। ফুল, ধূপ ও আগরবাতির সুবাসে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। ষষ্ঠীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে শনিবার ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন মহাসপ্তমী। সকাল থেকেই মন্ত্রোচ্চারণ ও দেবী দর্শনে মণ্ডপে মণ্ডপে ভিড় করছেন ভক্তরা।

মহাসপ্তমীতে দেবীর কাছে ভক্তদের প্রার্থনা—বিশ্বজুড়ে শান্তি, সম্প্রীতি, শক্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দিনটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভবোধের জাগরণ, প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং সাম্য ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গঠনের প্রত্যয়।

মহাসপ্তমীর অন্যতম প্রধান আচার নবপত্রিকা স্থাপন, যা সাধারণভাবে ‘কলাবউ’ নামে পরিচিত। কলাগাছের সঙ্গে কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ একত্রে বেঁধে স্নান করানোর পর নতুন শাড়ি পরিয়ে পূজামণ্ডপে স্থাপন করা হয়। প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই নয়টি উদ্ভিদ দেবীর নয়টি শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

নবপত্রিকা পূজার মধ্য দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কও প্রতিফলিত হয়। খাদ্য, চিকিৎসা, কৃষি ও জীবনের নানা ক্ষেত্রে উদ্ভিদের অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে। তাই ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার বাইরেও গাছপালা সংরক্ষণ, জলাশয় দূষণমুক্ত রাখা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি এ আচার থেকে গুরুত্ব পায়।

সপ্তমীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা হলো দেবীর মহাস্নান। এ আচার্যে দর্পণে দেবীমূর্তির প্রতিবিম্ব স্থাপন করে গঙ্গাজল, দুধ, মধু ও সুগন্ধি উপাচারের মাধ্যমে স্নান করানো হয়। ধর্মীয় বিশ্বাসে এটি বাহ্যিক ও আত্মিক শুদ্ধতার প্রতীক। এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো—শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, অন্যের অধিকার রক্ষা, বৈষম্য ও হিংসা পরিহার এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েও নৈতিক মূল্যবোধের প্রকাশ ঘটাতে হবে।

পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, মহিষাসুর বধের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গা শুভশক্তির বিজয় ও অশুভের পরাজয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। দেবীর দশ হাতের অস্ত্র অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার শক্তিকে নির্দেশ করে। প্রতিমায় দেবীর পাশে থাকা লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ যথাক্রমে সমৃদ্ধি, জ্ঞান, বীরত্ব ও প্রজ্ঞার প্রতীক। প্রতীকী অর্থে, জ্ঞান ছাড়া সমৃদ্ধি অর্থবহ হয় না, সাহস ছাড়া ন্যায় প্রতিষ্ঠা কঠিন এবং প্রজ্ঞা ছাড়া শক্তির যথাযথ প্রয়োগ সম্ভব নয়।

বাঙালির সংস্কৃতিতে দুর্গাপূজা কেবল দেবী আরাধনার উৎসব নয়, এটি পিতৃগৃহে কন্যার ফিরে আসার আবেগঘন পারিবারিক অনুভূতিরও প্রতিফলন। একই সঙ্গে প্রতিমাশিল্পী, মৃৎশিল্পী, ঢাকি, আলোকসজ্জাকর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কর্মযজ্ঞে দুর্গোৎসব বৃহৎ সামাজিক ও অর্থনৈতিক আয়োজনের রূপ নেয়। এই উৎসবকে ঘিরে বিভিন্ন পেশার মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকার সুযোগ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় মহাসপ্তমীর তাৎপর্য ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও নাগরিক নিরাপত্তার প্রত্যয়ের সঙ্গেও যুক্ত। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা ও ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সব ধর্মের মানুষ নির্ভয়ে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করতে পারেন।

ঢাকের বাদ্য একসময় থেমে যাবে, শেষ হবে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতাও। তবে মহাসপ্তমীর শিক্ষা—অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, প্রকৃতির প্রতি যত্নশীল হওয়া এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো—দৈনন্দিন জীবনেও ধারণ করা প্রয়োজন। শুভবোধ, মানবিকতা ও সম্প্রীতির চর্চার মধ্য দিয়েই উৎসবের তাৎপর্য জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ