এলএনজি টার্মিনাল ত্রুটিতে চাহিদার অর্ধেক সরবরাহ, দেশজুড়ে গ্যাসের জন্য হাহাকার
কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের জেরে সৃষ্ট যান্ত্রিক ত্রুটি দেশের দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে শিল্প খাত, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক এলাকা। বর্তমানে পেট্রোবাংলার সরবরাহ করা গ্যাস দৈনিক চাহিদার মাত্র ৫৬ শতাংশ, অর্থাৎ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৪ শতাংশে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তা এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারছে না তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।
তিতাসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, হঠাৎ একটি এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) বন্ধ হওয়ায় পাইপলাইনে জমে থাকা গ্যাসও দ্রুত ফুরিয়ে যায়, ফলে প্রকৃত সংকট আরও তীব্র আকার নেয় এবং টার্মিনাল সচল হলেও পরিস্থিতি সহজে স্বাভাবিক হয়নি। এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের পর দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, যার প্রভাবে সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ নেমে আসে প্রায় অর্ধেকে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সম্প্রতি জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহ নাগাদ সংকট কিছুটা কমতে পারে। এদিকে সরকার গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে নতুন করে অনুসন্ধান, কূপ খনন ও অফশোর কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। গ্যাস বিক্রির কমিশন বৃদ্ধিসহ চার দফা দাবিতে গত ৩০ জুলাই দেশজুড়ে সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখার যে কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল মালিক সমিতি, শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। তবে দাবি পূরণ না হলে আগামী ২৩ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংগঠনটি।
দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে গ্যাস সংকট সবচেয়ে তীব্র রূপ নিয়েছে। কোনাবাড়ী, মৌচাক, চন্দ্রা, টঙ্গী, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর ও বোর্ডবাজার এলাকার কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় ১০-১৫ পিএসআই চাপের জায়গায় মিলছে মাত্র ১-৩ পিএসআই, কোথাও কোথাও তা একেবারে শূন্যে নেমে যাচ্ছে। ফলে অন্তত অর্ধশত ছোট ও মাঝারি কারখানা উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেছে, আর বাকিগুলোতে উৎপাদন কমেছে ৫০-৬০ শতাংশ।
শিল্পখাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, লাইনে কার্যত কোনো গ্যাসই মিলছে না, দিনের পর দিন নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চেষ্টা চালিয়েও শেষে কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে। ন্যূনতম ৪ পিএসআই চাপ ছাড়া কারখানা চালানো অসম্ভব, অথচ অনেক সময় ১ পিএসআইও পাওয়া যায় না। গ্যাস সংকটে এ কারণে প্রায়ই অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকেরা এখন অলস সময় কাটাচ্ছেন।
ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ার রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলোতেও গ্যাস সংকটে উৎপাদন কমাতে হয়েছে। সকালে গ্যাস থাকলেও দুপুরের পর চাপ কমে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছানো নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের ডাইং শিল্পে সংকট আরও জটিল রূপ নিয়েছে। লাইনে গ্যাস না থাকায় এতদিন সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস এনে কারখানা চালানো হলেও তিতাসের নির্দেশে সেই বিকল্প ব্যবস্থাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ নিট ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহ মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেলে ডাইংয়ের মতো ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় পুরো কাপড়ই অকেজো হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় সমিতিভুক্ত দেড়শর মতো কারখানার উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে স্বাভাবিকের মাত্র ২০ শতাংশে, আর সংকট আরও কিছুদিন গড়ালে অনেক কারখানার ঝাঁপ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে আড়াইহাজারের মিথিলা টেক্সটাইল অ্যান্ড ওভেন ডাইং লিমিটেড এই সংকট থেকে অনেকটাই মুক্ত; আগেভাগে বায়োমাসনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করায় প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন এখনো স্বাভাবিক গতিতেই চলছে।
এছাড়াও খোজ নিয়ে জানা যায়, ময়মনসিংহের ভালুকায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও দিনে কয়েক দফা চাপ কমে যাওয়া এবং মাঝেমধ্যে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজের মহাব্যবস্থাপক মোকলেসুর রহমান সতর্ক করে বলেন, উৎপাদন ব্যয় এমনিতেই বেড়ে যাওয়ার মধ্যে গ্যাস সরবরাহ অস্বাভাবিক থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, মালিবাগ ও বিমানবন্দর এলাকাসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ ও নরসিংদীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস মিলছে না বলে অভিযোগ চালকদের। সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাষ্যমতে, স্বাভাবিক পরিচালনার জন্য অন্তত ১৫ পিএসআই চাপ প্রয়োজন হলেও এখন অনেক এলাকায় মিলছে ৪-৫ পিএসআই, কোথাও তারও কম।
আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তিও চরমে। মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা ও বাসাবোসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকছে না। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার এলপিজি, ইন্ডাকশন কুকার বা বৈদ্যুতিক চুলার শরণাপন্ন হচ্ছে, কেউ কেউ গভীর রাতে চাপ কিছুটা বাড়লে তখনই পরদিনের রান্না সেরে রাখছেন। সব মিলিয়ে দেশজুড়ে চলমান এই সংকট থেকে কবে পুরোপুরি মুক্তি মিলবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে সরকারি পর্যায়ে আশ্বাস মিলছে, আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটতে পারে।
মতামত দিন