Views Bangladesh Logo

কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী ফিরোজা বেগমের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

উপমহাদেশের সংগীতজগতের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী ফিরোজা বেগমের মৃত্যুবার্ষিকী আজ। নজরুলসংগীতকে সাধারণ শ্রোতার কাছে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তার অবদান অনন্য। দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি নজরুলসংগীতের পাশাপাশি আধুনিক গান, গজল, কাওয়ালি, ভজন, হামদ-নাত, লঘু শাস্ত্রীয় ও রবীন্দ্রসংগীতেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

১৯৩০ সালের ২৮ জুলাই ফরিদপুরের কাশিয়ানী থানার ঘোনাপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম ফিরোজা বেগমের। তার বাবা ছিলেন ব্রিটিশ আমলের প্রথম মুসলিম সরকারি আইনজীবী এবং সমাজহিতৈষী। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল তার। মাত্র আট বছর বয়সে সংগীতচর্চা শুরু করেন তিনি।

ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় অল ইন্ডিয়া রেডিওতে অডিশন দিয়ে শিশুশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন ফিরোজা বেগম। সেখান থেকেই শুরু হয় তার সংগীতজীবনের আনুষ্ঠানিক পথচলা। কিশোর বয়সে গান, অভিনয়, নৃত্য, আবৃত্তি ও সাঁতার—বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। অল ইন্ডিয়া রেডিওতে কাজী নজরুল ইসলামের বিভিন্ন নাটকেও গান ও অভিনয়ে অংশ নেন।

সংগীতশিক্ষায় তার অন্যতম শিক্ষক ছিলেন চিত্ত রায় ও কমল দাশগুপ্ত। পরবর্তী সময়ে কমল দাশগুপ্তের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। নজরুলসংগীতের চর্চা ও প্রসারে এই দম্পতির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কমল দাশগুপ্ত ছিলেন কাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সহচর, প্রখ্যাত শিল্পী, সুরকার ও সংগীত পরিচালক।

ফিরোজা বেগমের কণ্ঠে নজরুলসংগীতের অসংখ্য রেকর্ড প্রকাশিত হয়। তার গাওয়া গান শুনে সাধারণ মানুষের মধ্যে নজরুলসংগীতের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়। নজরুলসংগীতের পাশাপাশি উর্দু গজলসহ বিভিন্ন ধারার গানেও তার বহু রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছে। তার গাওয়া গান নিয়ে একাধিক দীর্ঘ প্লে, ইপি, সিডি ও অডিও ক্যাসেট প্রকাশিত হয়।

শুধু দেশে নয়, বিদেশেও বাংলা গান ও নজরুলসংগীতের প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ফিরোজা বেগম। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, স্কটল্যান্ড ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে তিনি সংগীত পরিবেশন করেন। জীবনে প্রায় ৩৮০টি একক সংগীতানুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়।

কণ্ঠশিল্পীর পাশাপাশি স্বরলিপিকার হিসেবেও তার অবদান স্মরণীয়। কাজী নজরুল ইসলাম অসুস্থ হয়ে পড়ার পর নজরুলসংগীতের স্বরলিপি সংরক্ষণের কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬০ সালে তার তৈরি স্বরলিপি পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত হয়। পরে বাংলা একাডেমির অনুরোধে তিনি ১০০টি নজরুলসংগীতের স্বরলিপি দেন। নজরুল একাডেমি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকেও তিনি বহু গানের স্বরলিপি প্রদান করেন।

সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ফিরোজা বেগম পেয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পদক ও একুশে পদক। এ ছাড়া দেশ-বিদেশে আরও বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।

সংগীতের পাশাপাশি সমাজকল্যাণমূলক কাজেও যুক্ত ছিলেন এই শিল্পী। বারডেম হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্রের সহায়তায় তিনি একাধিক দাতব্য সংগীতানুষ্ঠানে অংশ নেন।

কমল দাশগুপ্ত ও ফিরোজা বেগম দম্পতির তিন ছেলে। দীর্ঘ বর্ণাঢ্য সংগীতজীবনের অবসান ঘটিয়ে ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন উপমহাদেশের এই কিংবদন্তি শিল্পী। মৃত্যুর এক যুগ পরও তার কণ্ঠে গাওয়া নজরুলসংগীত বাংলা সংগীতপ্রেমীদের কাছে সমানভাবে প্রিয়।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ