পরিবারের হাল ধরতে ছেড়েছিলেন পড়াশোনা, ৫৪ বছরেও এসএসসি পাশ আলী আকবরের
‘বয়স কেবল একটা সংখ্যা’—অদম্য ইচ্ছেশক্তি থাকলে যেকোনো বয়সেই সাফল্য ছোঁয়া সম্ভব, তাই যেন প্রমাণ করলেন নাটোরের বাগাতিপাড়ার আলী আকবর। ৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৪.৩৫ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।
জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে সংসারের অভাব-অনটন আর সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার কঠিন সংগ্রামে। নিজের লেখাপড়ার স্বপ্নকে একপাশে সরিয়ে রেখে আগে সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অবশেষে জীবনের এই পর্যায়ে এসে সেই অপূর্ণ স্বপ্নকে আবার জাগিয়ে তুলেছেন তিনি।
আলী আকবর নাটোরের বাগাতিপাড়া পৌরসভার পেড়াবাড়িয়া মহল্লার মোল্লা শেখ খোকার ছেলে। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘আলী আজম’ নামেও পরিচিত।
কর্মসূত্রে রাজশাহীতে অবস্থান করায় সেখানকার নওহাটা সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি হাই স্কুলের কারিগরি শাখা থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। প্রথমবারেই কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন এই প্রবীণ শিক্ষার্থী।
নিজের জীবনের সংগ্রাম ও সাফল্যের কথা জানাতে গিয়ে আলী আকবর বলেন, অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। কয়েক ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে ছোটবেলাতেই লেখাপড়া ছেড়ে বাবার সঙ্গে পরিবারের হাল ধরতে হয়েছিল তাকে। পরবর্তী সময়ে বিয়ে করেন; সংসারে আসে এক মেয়ে ও এক ছেলে। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে তাকে আরও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।
একপর্যায়ে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে কর্মচারী পদে চাকরিতে যোগ দেন আলী আকবর। স্বামী-স্ত্রীর উপার্জিত অর্থ দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যান। বাবা-মায়ের কষ্টের মর্যাদা দিয়ে বড় মেয়ে আজ নার্সিং পেশায় যুক্ত হয়েছেন এবং ছোট ছেলে ইসমাইল হোসেন এমবিবিএস পাস করে বর্তমানে সরকারি চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত আছেন।
সন্তানদের সাফল্যের পর নিজের স্বপ্ন পূরণের পথ চলার বিষয়ে আলী আকবর বলেন, সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে নিজের পড়াশোনার ইচ্ছেটাকে বিসর্জন দিয়েছিলাম। মেয়েকে নার্স ও ছেলেকে ডাক্তার বানিয়েছি। এখন তারা নিজ নিজ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। তাই মনে হলো, জীবনের বাকি সময়টুকু আর বসে না থেকে নিজের অপূর্ণ স্বপ্নটাও পূরণ করি।
তিনি আরও বলেন, আবার পড়াশোনা শুরু করলাম। এরপর ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিই। আলহামদুলিল্লাহ, প্রথমবারেই জিপিএ-৪.৩৫ পেয়ে পাস করেছি। এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
এ বিষয়ে ওই পেড়াবাড়িয়া মহল্লার সাবেক কমিশনার আবু হেনা মো. কামরুজ্জামান বলেন, ৫৪ বছর বয়সে আলী আকবরের এসএসসি পাসের ঘটনা আমাদের জন্য গর্বের। এই বয়সে এসে পড়াশোনা করে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়া অদম্য ইচ্ছাশক্তি, মনোবল ও অধ্যবসায়ের প্রমাণ। তার এই সাফল্য এলাকার তরুণ প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার।
মতামত দিন