Views Bangladesh Logo

জনমত উপেক্ষা করে এনসিটি–সিসিটিকে ইজারা দিলে জনগণ তা প্রতিহত করবে: বন্দর রক্ষা কমিটির হুঁশিয়ারি

জনমত উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) কোনো দেশি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের—বিশেষ করে ডিপি ওয়ার্ল্ডের—কাছে কনসেশন মডেলে ইজারা দেওয়া হলে জনগণ তা মেনে নেবে না এবং এমন চুক্তি বাস্তবায়নও হতে দেবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন গোলটেবিল বৈঠকের বক্তারা।

আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় চট্টগ্রামের হোটেল সৈকতের হালদা হলে বন্দর রক্ষা কমিটি, চট্টগ্রাম আয়োজিত ‘চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি–সিসিটি ইজারা: বাংলাদেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন তারা।

বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন সংগঠনের সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু। সভায় বক্তব্য দেন কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন, সিপিবির সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বামপন্থী নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স, প্রকৌশলী সুভাষ চন্দ্র বড়ুয়া, সিপিবির সাবেক সভাপতি কমরেড মোহাম্মদ শাহ আলম, টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এ. এম. নাজিম উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, কমরেড অশোক সাহা, ডক জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম, অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, নারী নেত্রী জেসমিন সুলতানা পারুল, প্রকৌশলী শহীদুল আলম, সাইফুদ্দিন খালেদ চৌধুরী ও সিনিয়র সাংবাদিক জসিম চৌধুরী সবুজ।

ধারণাপত্রে বলা হয়, এনসিটি ও সিসিটি জনগণের টাকায় নির্মিত জাতীয় সম্পদ; বিদেশি অর্থায়নে নির্মিত নয়। দেশীয় জনবল বহু বছর ধরে টার্মিনাল দুটি সফলভাবে আন্তর্জাতিক মানে পরিচালনা করে আসছে। তাহলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে এগুলোর পরিচালনার ভার তুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কোথায়—সরকার এখনো তার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

দেশীয় ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে ধারণাপত্রে তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, এনসিটির নকশাগত সক্ষমতা প্রায় ১১ লাখ টিইইউস হলেও বর্তমানে বছরে প্রায় ১৩ লাখ টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হচ্ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে এক মাসেই প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার টিইইউস কন্টেইনার পরিচালনার নতুন রেকর্ড হয়েছে। কাজেই ‘বিদেশি অপারেটর ছাড়া বন্দর চলবে না’—এমন প্রচারণা তথ্যভিত্তিক নয়। তা ছাড়া এনসিটি এখন দেশের সবচেয়ে আধুনিক ও যান্ত্রিকীকৃত কন্টেইনার টার্মিনাল; অধিকাংশ গ্যান্ট্রি ক্রেন, আরটিজি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির বয়স মাত্র চার-পাঁচ বছর। ফলে রাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগের সুফল বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

ধারণাপত্রে সতর্ক করে বলা হয়, কনসেশন মডেলে কাগজে-কলমে রাষ্ট্রের মালিকানা বহাল থাকলেও বাস্তবে পরিচালনা, বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত, ট্যারিফ নির্ধারণ ও অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যেতে পারে। এতে রাষ্ট্রের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে বন্দরের উদ্বৃত্ত আয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হলেও কনসেশন মডেলে পরিচালন মুনাফার বড় অংশ ব্যবস্থাপনা ফি, রয়্যালটি ও লভ্যাংশের নামে বিদেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে; বাড়বে প্রযুক্তি, সম্প্রসারণ ও পরিচালনায় বিদেশনির্ভরতাও।

চূড়ান্ত চুক্তির আগেই কন্টেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ প্রায় ৩৭ শতাংশ বাড়ানোর অভিযোগও তোলা হয় ধারণাপত্রে। বলা হয়, এই বাড়তি চাপ আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান হয়ে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর পড়ছে; অথচ লাভজনকভাবে চলা একটি টার্মিনালে এমন মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতাও সরকার জনগণের সামনে ব্যাখ্যা করতে পারেনি।

জাতীয় নিরাপত্তার প্রসঙ্গ টেনে ধারণাপত্রে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে রয়েছে নৌবাহিনীর ঘাঁটি, বিমানবাহিনীর স্থাপনা, ইস্টার্ন রিফাইনারি, জ্বালানি সংরক্ষণাগারসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থাপনা। ফলে এনসিটি ও সিসিটির দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা শুধু অর্থনৈতিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও সামনে আনে। আরও অভিযোগ করা হয়, সম্ভাব্য কনসেশন চুক্তির মেয়াদ, আর্থিক কাঠামো, রাজস্ব বণ্টন, দায়বদ্ধতা ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার শর্তাবলি এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। রাষ্ট্রীয় সম্পদের বিষয়ে গোপনীয়তার সুযোগ নেই; নিশ্চিত করতে হবে জনগণের জানার অধিকার।

সভায় কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং প্রায় দেড় হাজার বছরের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের ধারক। বন্দরের মতো কৌশলগত জাতীয় সম্পদ নিয়ে আবেগ বা তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নয়; আগামী ৫০ বছরে দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থে এর প্রভাব কী হবে, তা গভীরভাবে মূল্যায়ন করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে এনসিটি–সিসিটি ইজারা দেওয়ার ষড়যন্ত্রে যারা জড়িত, তারা যেন অতীতের রাজনৈতিক পরিণতি থেকে শিক্ষা নেয়। জনগণের মতামত উপেক্ষা করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।

বক্তারা অবিলম্বে এনসিটি–সিসিটি–সংক্রান্ত সব তথ্য প্রকাশের দাবি জানান। একই সঙ্গে স্বাধীন অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও আইনগত মূল্যায়ন এবং সংসদীয় আলোচনা ও জনপরামর্শ ছাড়া কোনো দীর্ঘমেয়াদি কনসেশন চুক্তি না করারও দাবি তোলেন তারা। দেশীয় ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, বিদেশি কারিগরি সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালন নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই রাষ্ট্রের হাতছাড়া করা যাবে না।

সভা থেকে বক্তারা স্পষ্ট ঘোষণা দেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদস্পন্দন; এই বন্দর কোনো করপোরেট স্বার্থ বা বিদেশি নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষাগার হতে পারে না। জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো ইজারা চুক্তি জনগণ মেনে নেবে না এবং প্রয়োজনে সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের মাধ্যমে তা প্রতিহত করা হবে।


মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ