সংবিধান সংস্কারে যেসব বিষয়ে একমত রাজনৈতিক দলগুলো
সংবিধানে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, বহুত্ববাদ এবং গণতন্ত্র’ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবে ‘বহুত্ববাদ’ শব্দটি না রাখার ব্যাপারে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল মতামত দিয়েছে। তবে বাকি চারটি মূলনীতির বিষয়ে এক ধরনের ঐকমত্য রয়েছে। পাশাপাশি, অনেক দল এই চারটির বাইরে আরও কিছু বিষয় যুক্ত করার পরামর্শও দিয়েছে।
সোমবার (২৬ মে) জাতীয় সংসদের এলডি হলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ এক ব্রিফিংয়ে কমিশনের কার্য অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো মতভেদ নেই।
নাগরিকদের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অধিকার আরও প্রসারিত করা এবং কিছু অধিকারকে রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবে সম্মতি থাকলেও, অধিকারগুলোর তালিকা ও প্রয়োগের মাত্রা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠনের বিষয়ে অধিকাংশ দল নীতিগতভাবে একমত। তবে কিছু দল এককক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থার পক্ষে মত দিয়েছে। নিম্নকক্ষে নারীদের জন্য ১০০ আসন সংরক্ষণের বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য থাকলেও, পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
উভয় কক্ষের সংসদ হোক বা এককক্ষবিশিষ্ট — ডেপুটি স্পিকার পদ বিরোধী দলের হাতে রাখার বিষয়ে প্রায় সব দল একমত। যেসব দল উচ্চকক্ষের পক্ষে, তারা ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে প্রতিনিধিদের নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে এখনো ঐকমত্য হয়নি।
সংবিধানের ৪৮(ক) অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়ে একমত হলেও, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে হবে — তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।
৭০ অনুচ্ছেদ (সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়া নিষিদ্ধ থাকা) নিয়ে পরিবর্তনের বিষয়ে ঐকমত্য থাকলেও, কোন কোন বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত মানা বাধ্যতামূলক হবে, সে তালিকায় আংশিক ঐকমত্য হয়েছে। অধিকাংশ দল অর্থ বিল, আস্থা ভোট এবং সংবিধান সংশোধন বিলে দলীয় শৃঙ্খলার পক্ষে। কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিষয়ক বিলও এতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
সংসদের গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতির পদ বিরোধী দলের হাতে দেওয়ার বিষয়ে প্রায় সব দল একমত। বিশেষ করে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি, এস্টিমেট কমিটি, পাবলিক আন্ডারটেকিং কমিটি ও প্রিভিলেজ কমিটির সভাপতিত্ব বিরোধী দলের কাছে রাখার বিষয়টি বিবেচনায় আছে।
তবে বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠন, প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচিত হওয়ার সংখ্যা, সংসদ সদস্যদের একাধিক পদে থাকার সুযোগ, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া, সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া ইত্যাদি মৌলিক কাঠামোগত বিষয়ে এখনো ঐকমত্য হয়নি। তবে এসব বিষয়ে অধিকাংশ দল আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ৫টি কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন থেকে ১৬৬টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ নিয়ে ৩৮টি রাজনৈতিক দল ও জোটের কাছে মতামত চেয়ে স্প্রেডশিট পাঠায়।
এর মধ্যে সংবিধান সংস্কার–সংক্রান্ত ৭০টি, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার ২৭টি, বিচার বিভাগ–সংক্রান্ত ২৩টি, জনপ্রশাসন ২৬টি এবং দুর্নীতি দমন কমিশন বিষয়ে ২০টি সুপারিশ ছিল।
প্রত্যেক সুপারিশের ব্যাপারে দলগুলোর ‘একমত’, ‘একমত নই’ ও ‘আংশিক একমত’ এই তিনটি বিকল্পের মধ্যে টিক দিয়ে মতামত দিতে বলা হয়। সঙ্গে মন্তব্য জানানোর সুযোগও রাখা হয়েছিল।
প্রথমে ১৫ মার্চের মধ্যে মতামত চাওয়া হলেও, কয়েকটি দলের অনুরোধে সময় বাড়িয়ে মোট ৩৫টি রাজনৈতিক দল ও জোটের কাছ থেকে মতামত পাওয়া গেছে। অনেকে স্প্রেডশিটের পাশাপাশি বিস্তারিত মন্তব্য ও বিশ্লেষণও জমা দিয়েছে।
এ ছাড়া গত ২০ মার্চ থেকে ১৯ মে’র মধ্যে ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ৪৫টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। কয়েকটি দলের সঙ্গে একাধিক দিন বৈঠকও হয়।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে