উত্তরবঙ্গের তুরি জাতিসত্তা থেকে প্রথম জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত কাজল পাড়ে
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের প্রত্যন্ত মাধাইপুর গ্রাম সেখানে সরকারি খাস পুকুর পাড়ে বসবাস। টানাটানির সংসার, শত অভাবের মাঝেও ছোট মাধাইপুর গ্রামকে আলোকিত করেছেন কাজল পাড়ে।
চার ভাইবোনের মধ্যে কাজল পাড়ে সবার ছোট এবং একমাত্র ভাই। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে গণ্ডি পেরিয়েছেন সাফল্যের সঙ্গে। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অনার্স মাস্টার্স শেষ করেছেন। তিনি এখন বিসিএস ক্যাডার।
সমতলের আদিবাসী ‘তুরি’ জনগোষ্ঠীর ছেলে কাজল (২৯)। ‘পাঁড়ে’ তুরি জনগোষ্ঠীর একটি পদবি। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সিভিল জজ (সহকারী জজ) হিসেবে সুপারিশ পেয়েছেন তিনি।
বুধবার সন্ধ্যায় এক বন্ধুর ফোনে ফল প্রকাশের খবর পান কাজল। পরে ওয়েবসাইটে ফল দেখে কাজল নিশ্চিত হন, ২০০ জনের মধ্যে তাঁর অবস্থান ১৪০তম। তাঁর স্বপ্নপূরণের খবর ছড়িয়ে পড়লে গ্রামে শুরু হয় আনন্দ। ভূমিহীন কৃষক পরিবারের একমাত্র ছেলে কাজল। তাঁর স্বপ্নের কথা গ্রামের মানুষ জানতেন। গ্রামের শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস ছিল, কাজল একদিন বিচারক হবেন।
কিন্তু শিক্ষাজীবনের এ পথচলা তার সহজ ছিলনা। কাজল পাড়ে বলেন, অভাবের তাড়নায় একসময় আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। বাবা অনেক কষ্ট করে শ্রমিকের কাজ করে আমার লেখা পড়ার খরচ চালিয়েছেন। সবার দরিদ্রতা থাকে কিন্তু আমার ছিলো দরিদ্রতা একই সাথে সামাজিক প্রতিবন্ধীকতা, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা।
তিনি আরও বলেন, আমি প্রথমেই ধাক্কা খেয়েছিলাম প্রাথমিকে বিদ্যালয়ে যখন সবাই বাংলা কথা বলছিলো। আমার মাতৃভাষায় কথা বলে আমি অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু ক্লাসে যখন সহপাঠী ও শিক্ষকেরা বাংলায় কথা বলতো সে সময় আমি ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার স্বীকার হই। পরে আস্তে আস্তে ভাষাগত দিকটা জয় করার পর শিক্ষকদের কথা বুঝতে পারতাম। এটা ছিলো আমার জীবনের অন্যতম কষ্টের জায়গা। তাছাড়া আর্থিক সংকট বরাবরই ছিলো। কিন্তু আমার বাবার অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ও আমার চেষ্টায় আর্থিক সংকটগুলোর সাথে লড়াই করেই টিকে ছিলাম। সুপারিশ প্রাপ্ত হওয়ার পর আমার বাবা মা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মত আমিও আনন্দিত।
তার বাবা নরেশ পাড়ে বলেন, কৃষি কাজ করে ছেলেকে লেখাপড়া করিয়েছি। আমাদের এলাকায় ছয় মাস কাজ থাকে আর ছয় মাস কাজ থাকে না তখন আমি নড়াইল, খুলনা ও ফরিদপুর এলাকায় গিয়ে কাজ করে এনে ছেলের লেখা পড়ার খরচ চালিয়েছি। এতেও যখন খরচ চালাতে ব্যর্থ হই তখন গরু বিক্রি করে খরচ চালিয়েছি। আমার ছেলের এই সাফল্যে আমার সাথে সাথে হিন্দু-বৌদ্ধ ও মুসলিম সবাই খুশি হয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য লোক আমার বাসাতে আমার ছেলেকে দেখার জন্য ভিড় জমাচ্ছে।
তার মা পঞ্চমী জেরি বলেন, কষ্ট করে খেয়ে না খেয়ে ছেলের লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছি। আমার স্বামী দেশ-বিদেশে খেটে নিয়ে এসেছিলো ছেলেকে মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তোলার জন্য। আমার ছেলের এই সাফল্যে আমার অনেক খুশি লাগছে।
তার ছোট বোন স্বপ্ন জানান, এইচএসসি পাশ করার আমার ভাই রাজশাহী যাবে পড়তে। তখন আমরা নিষেধ করি আমরা গরীব মানুষ এত টাকা কোথায় পাবো যেতে হবে না। তখন আমার ভাই বলেছিলো দিদি রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে পড়লে আমার টাকা লাগবে না। কতো দিন আমরা পান্তা ভাত খেয়ে দিন পার করেছি। আজ আমার ভাই জজ হয়ছে অনেক খুশি লাগছে।
তুরি জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাজল পাঁড়েই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাতালিকায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী বলে জানান জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক বিভূতিভূষণ মাহাতো। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের মধ্যেও কাজলই প্রথম জুডিশিয়ারিতে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
দারিদ্র্যের কারণে কাজলের পথ সহজ ছিল না। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছেন, পরিবারকেও সহায়তা করেছেন। সেই সংগ্রাম পেরিয়ে বিচারক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে এখন আনন্দিত তাঁর পরিবারসহ মাধাই গ্রামের মানুষ।
মতামত দিন