Views Bangladesh Logo

সহকারী জজ হয়ে ইতিহাস গড়লেন ‘তুরি’ নৃগোষ্ঠীর কাজল

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার মাধাইপুর গ্রামে ২২ বছর ধরে কোনো সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন না। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার সরকারি কর্মকর্তা হতে যাচ্ছেন গ্রামের তরুণ কাজল পাঁড়ে। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় ২০০ জনের মধ্যে ১৪০তম হয়ে সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশ পেয়েছেন ‘তুরি’ নৃগোষ্ঠীর এই তরুণ।

কাজলের এই অর্জন শুধু একটি পরিবারের সাফল্য নয়, মাধাইপুর গ্রামের জন্যও নতুন এক অধ্যায়ের শুরু। কারণ, গ্রামটির ইতিহাসে তিনিই প্রথম সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন। ফল প্রকাশের পর তাই তাকে ঘিরে গ্রামজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ। রাজশাহী থেকে বাড়িতে ফেরার পর গ্রামবাসী ফুলের মালা দিয়ে তাকে বরণ করে নেন।

কাজলের বেড়ে ওঠা এমন একটি পরিবারে, যেখানে উচ্চশিক্ষার কথা ভাবাটাই ছিল কঠিন। তার বাবা নরেশ পাঁড়ে ভূমিহীন কৃষক। মা পঞ্চমী জেড়ি গৃহিণী। সংসারে অভাবের কারণে কাজলের তিন বোনের পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি। কিন্তু একমাত্র ছেলে কাজলের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য পরিবারটি নিজেদের সামর্থ্যের শেষটুকুও কাজে লাগিয়েছে।

মাধাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার শুরু কাজলের। পরে মিশন স্কুল, এনায়েতপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও রহনপুর ইউসুফ আলী কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনা শেষ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রথম চেষ্টায় সফল না হলেও পরেরবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান। শেষ পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগকে নিজের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই বিচার বিভাগে যাওয়ার লক্ষ্য স্থির করেন কাজল। তবে লক্ষ্য ঠিক করলেই পথ সহজ হয়ে যায়নি। পড়াশোনার খরচ চালাতে ক্যাম্পাসে টিউশনি করেছেন তিনি। নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছে সীমিত আয়ের মধ্যেই।

অন্যদিকে ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে বাবা নরেশ পাঁড়েকেও নানা ধরনের কাজ করতে হয়েছে। কখনো গরু বিক্রি করেছেন, কখনো কাজের বিনিময়ে টাকা কর্মসূচিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। এনজিওর কিস্তির চাপও সামলাতে হয়েছে তাকে। অভাবের সংসারে ছেলের পড়াশোনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বছরের পর বছর লড়াই করেছেন তিনি।

২০১৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর পরবর্তী আট বছর কাজলের সামনে ছিল একটি লক্ষ্য—বিচার বিভাগে যাওয়া। নানা অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যেও সেই লক্ষ্য থেকে সরে যাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে।

কাজল পাঁড়ে বলেন, এই সাফল্যের মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে পরিবারের ত্যাগের কথা। পড়াশোনার পথে বাবা-মায়ের কষ্ট, নিজের পরিশ্রম এবং কঠিন সময়গুলো তাকে লক্ষ্য ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।

ছেলের সাফল্যে আবেগাপ্লুত মা পঞ্চমী জেড়ি। তার ভাষায়, অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে ছেলে বড় হয়েছে। নিজের জন্য যে স্বপ্ন দেখেছিল, সেটি পূরণ করতে পেরেছে—এটাই তার সবচেয়ে বড় আনন্দ। বাবা নরেশ পাঁড়ের প্রত্যাশা, ছেলে ভবিষ্যতে শুধু নিজের পরিবারের নয়, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশেও দাঁড়াবেন।

কাজলের এই অর্জন তার নিজস্ব সম্প্রদায়ের মধ্যেও নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক বিভূতিভূষণ মাহাতোর দাবি, তুরি সম্প্রদায়ের মধ্যে মেধার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া প্রথম ব্যক্তি কাজল। তার ভাষায়, উত্তরবঙ্গের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একজন তরুণের বিচার বিভাগে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

গ্রামের প্রবীণ জারাধন পাণ্ডে বলেন, তাদের সম্প্রদায়ের কেউ এর আগে এমন জায়গায় পৌঁছাতে পারেননি। ফলে কাজলের সাফল্যের খবর তাদের কাছে শুধু আনন্দের নয়, গর্বেরও।

মাধাইপুর গ্রামের প্রধান নিরঞ্জন তিরকি মনে করেন, কাজলের সাফল্য গ্রামের শিশু-কিশোরদের জন্য নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। একই কথা বলেছেন স্থানীয় পার্বতীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেনও। তার মতে, আর্থিক সামর্থ্য না থাকলেও মেধা, অধ্যবসায় ও পরিশ্রম দিয়ে যে বড় জায়গায় পৌঁছানো যায়, কাজল তার উদাহরণ তৈরি করেছেন।

কাজলের সাবেক শিক্ষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সাজ্জাদ আলীও তার সাফল্যে গর্বিত। তার ভাষায়, মাধাইপুরের মতো প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পরিবারের একজন শিক্ষার্থী বিচারক হওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়া পুরো গ্রামের জন্যই বড় অর্জন। কাজলের এই সাফল্য আগামী দিনে গ্রামের আরও অনেক শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখাবে—এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ