Views Bangladesh Logo

সাংবিধানিক দায়মুক্তি পাচ্ছেন জুলাইযোদ্ধারা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধন কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও বাধ্যতামূলক গণভোটের বিধান পুনর্বহাল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি নিশ্চিতের পাশাপাশি এর বীর রাজনৈতিক ও সাধারণ অংশগ্রহণকারীদের ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে সুনির্দিষ্ট তফসিলে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা বা দায়মুক্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির ষষ্ঠ বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সালাউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ভিত্তিতেই সংবিধান সংশোধনের নতুন বিল সংসদে উপস্থাপন করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলো নোট অব ডিসেন্টসহ যেভাবে স্বাক্ষর করেছে, সরকার সেভাবেই তা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। সংবিধানে এমন কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সাংবিধানিক সংশোধনের ক্ষেত্রে জনগণের মতামত নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক গণভোটের বিধানও ফিরিয়ে আনা হবে।

ষষ্ঠ বৈঠকে ৬৩ জন প্রতিনিধি অংশ নেন বলে জানান তিনি। সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তালিকা থেকে জুলাইযোদ্ধাদের প্রতিনিধি হিসেবে শহীদদের মা-বাবা, ভাই এবং আহতদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং বিশেষ করে জুলাই ঘোষণাপত্রের প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো সংবিধানের উপযুক্ত স্থানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। কেউ কেউ ঘোষণাপত্রটি সংবিধানের প্রস্তাবনায় যুক্ত করার প্রস্তাবও দেন।

এ বিষয়ে কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শক্তি যেভাবে ঐকমত্যে পৌঁছেছে, সংবিধানে সেভাবেই বিষয়গুলো ধারণ করা হবে। প্রতিনিধিদের দেওয়া সব প্রস্তাব লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।

জুলাইযোদ্ধাদের আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষার বিষয়ে সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, আগে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে যে আইন করা হয়েছিল, সেটি বহাল রয়েছে। তবে বিচারিক বাধ্যবাধকতা ও আইনি জটিলতা এড়াতে সংবিধানের তফসিলে সুনির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণ করে জুলাইযোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

মন্ত্রী বলেন, সরকার ও আদালত বিচারিক কার্যক্রমে স্বাধীন হলেও তদন্ত, প্রসিকিউশন ও অভিযোগ গঠনের মতো বিচারসহায়ক কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে সরকার আন্তরিক। পাশাপাশি দণ্ডবিধির অধীনে অন্যান্য আদালতে চলমান মামলাগুলোও নিবিড় তদারকির মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় দীর্ঘ ছয় থেকে সাত মাসের আলোচনার ভিত্তিতে একটি জাতীয় ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হয়েছিল। ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দল এতে একমত পোষণ করেছিল। সংবিধানের তফসিলে এটিকে এমনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যাতে এর আইনি ভিত্তি নিশ্চিত হয় এবং জুলাইযোদ্ধারা সাংবিধানিক দায়মুক্তি ও নিরাপত্তা পান।

বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান ও মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় সনদে যেভাবে স্বাক্ষর করেছে, সরকার ঠিক সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করছে। নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া সনদ বাস্তবায়নের সুযোগ নেই, কারণ ঐকমত্য সেভাবেই হয়েছিল। জাতীয় স্বার্থ এবং নির্বাচনী ইশতেহারের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সর্বজনগ্রাহ্য একটি বিল সংসদে উপস্থাপন করা হবে।

সংবিধানে গণভোট ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অতীতে যে গণভোটের কথা বলা হয়েছিল, সেটি ছিল আইনি গণভোট। তবে এবার যেসব পরিবর্তন আনা হচ্ছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে সাংবিধানিকভাবে বাধ্যতামূলক গণভোটের বিধান থাকবে। সংবিধানের প্রস্তাবনা, অনুচ্ছেদ ৮-এ উল্লিখিত মূলনীতি, অনুচ্ছেদ ৪৮ ও ৫৬ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার মতো বিষয়ে মৌলিক পরিবর্তন আনা হলে সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে জনগণের রায়ের জন্য গণভোট আয়োজন করতে হবে।

তিনি বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান তুলে দেওয়াকে হাইকোর্ট ইতোমধ্যে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন। ‘ডকট্রিন অব ইক্লিপস’ বা গ্রহণ তত্ত্বের আলোকে ওই বাতিলের সিদ্ধান্তও কার্যত দূর হয়ে আগের আইনি অবস্থার পুনর্বহাল হয়েছে। সংসদে সংশ্লিষ্ট বিধান পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত হলে গণভোটের বিষয়টি আর প্রশ্নের মুখে থাকবে না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামো প্রসঙ্গে সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৯৬ বা ২০০৬ সালের কাঠামো হুবহু অনুসরণ করা হচ্ছে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন এবং কোন প্রক্রিয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকার সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, বিচারক, সাবেক বিচারপতি, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের মতামত নিচ্ছে।

অতীতে এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় রাষ্ট্রপতির কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্ব অর্পণের বিকল্পটি বাদ দেওয়ার পক্ষে সরকারের অবস্থান রয়েছে বলেও জানান তিনি। রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে কেউ রাজপথে লংমার্চ বা কর্মসূচি পালন করলে সেটিকে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে দেখা হবে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংসদে আলোচনার মাধ্যমেই নেওয়া হবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ