চীনের ১৪ বছরের শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক পাঠ্যতালিকায় ‘জেন আয়ার’
চীনের ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের নতুন শিক্ষাবর্ষে বাধ্যতামূলক পাঠ্যতালিকায় জায়গা পেয়েছে ব্রিটিশ সাহিত্যিক শার্লট ব্রন্টের বিখ্যাত উপন্যাস ‘জেন আয়ার’। নারীর আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা ও প্রেমের গল্প হিসেবে পরিচিত ১৮৪৭ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসকে চীনা কর্তৃপক্ষ কিশোরদের সুস্থ মূল্যবোধ গঠনের সহায়ক হিসেবে তুলে ধরছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র বেইজিং ডেইলির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে তরুণদের মধ্যে চেহারা, অর্থ-সম্পদ ও সামাজিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের যে ধারণা তৈরি হচ্ছে, তার বিপরীতে ‘জেন আয়ার’ ভালোবাসা ও সম্পর্কের বিষয়ে তুলনামূলক গভীর দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে। উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র অনাথ জেনের সংগ্রাম, আত্মনির্ভর হয়ে ওঠা এবং শেষ পর্যন্ত তার ধনী নিয়োগকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চীনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনলাইন উপন্যাস ও স্বল্পদৈর্ঘ্য ধারাবাহিকে ধনসম্পদের প্রদর্শন, ধনকুবের চরিত্র, প্রতিশোধ ও অতিনাটকীয় প্রেমের গল্প ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে। এসব কনটেন্ট নিয়ে কর্তৃপক্ষের উদ্বেগও রয়েছে। গত জুনে সম্প্রচার নিয়ন্ত্রক সংস্থা তথাকথিত ‘ক্ষতিকর ও নিম্নরুচির’ বিষয়বস্তুর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এ ধরনের কিছু কাহিনি প্রেম ও বিয়ে সম্পর্কে বিকৃত ধারণা তৈরি করছে।
চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যমের ব্যাখ্যায়, কৈশোরে কিশোর-কিশোরীরা যখন প্রথম প্রেমের অনুভূতির মুখোমুখি হয়, তখন তাদের চরিত্র ও মূল্যবোধ গঠনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় ধ্রুপদি সাহিত্য পাঠের মাধ্যমে সম্পর্ক, আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিগত মূল্যবোধ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
চীনে ‘জেন আয়ার’-এর জনপ্রিয়তা অবশ্য নতুন নয়। ১৯২৫ সালে উপন্যাসটি প্রথম চীনা পাঠকদের কাছে পৌঁছানোর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে এটি অনূদিত ও পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে। মঞ্চনাটক ও চলচ্চিত্রেও এর একাধিক রূপান্তর হয়েছে। ১৯৭৯ সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর একটি ব্রিটিশ চলচ্চিত্র সংস্করণ চীনের প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির শ্রমজীবী শ্রেণির মধ্যেও জেন আয়ারকে নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে।
তবে নতুন পাঠ্যক্রমে উপন্যাসটি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় প্রশ্নও উঠেছে। বিশেষ করে চীনে নারীবাদী আলোচনা ও সক্রিয়তার বিভিন্ন বিষয় যখন বাড়তি নজরদারি ও সমালোচনার মুখে, তখন ‘জেন আয়ার’-এর মতো একটি উপন্যাসকে কীভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা হবে—তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কিছু অভিভাবকও মনে করছেন, বর্তমান প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীদের কাছে উপন্যাসটির জটিল প্রেমের কাহিনি কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিশ্চিত নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিয়াওহংশুতে এক অভিভাবক লিখেছেন, তার ছেলে জানতে চেয়েছে—‘জেন আয়ার’ পড়ানোর অর্থ কি শ্রেণির মেয়েদের শেখানো যে তাদের জীবন ও সিদ্ধান্ত প্রেমের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত? উপন্যাসের শেষদিকে জেনের একজন অন্ধ পুরুষকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েও তার ছেলের প্রশ্ন রয়েছে বলে জানান ওই অভিভাবক।
অন্যদিকে বেইজিংয়ের সাম্প্রতিক এক চীনা সাহিত্য স্নাতক ছাত্রী ছিন শিওয়েন মনে করেন, মৌলিক শিক্ষায় ‘জেন আয়ার’-এর মতো ধ্রুপদি সাহিত্য থাকা দরকার। তাঁর মতে, চীনের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার ফল ও একাডেমিক সাফল্যের ওপর জোর থাকলেও ভালোবাসা, চরিত্র ও মূল্যবোধ নিয়ে শিক্ষার জায়গাটি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়।
তবে সাহিত্যকর্ম হিসেবে ‘জেন আয়ার’ সমালোচনার বাইরেও নয়। সাম্প্রতিক সময়ে উপন্যাসে ‘চিলেকোঠার পাগল নারী’ চরিত্রের উপস্থাপন এবং এর মধ্যে ঔপনিবেশিক চিন্তার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের গবেষক ইয়ান হাইরংও এসব বিষয়কে উপন্যাসটি শিক্ষার্থীদের পড়ানোর ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করেন।
মতামত দিন