একাত্তরে দেশ চায়নি জামায়াত, ইশতেহারেও ইসলাম নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়কার ভূমিকা থেকে শুরু করে বর্তমান রাজনীতিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, মুখে ইসলামের কথা বললেও দলটির ৯৩ পৃষ্ঠার নির্বাচনী ইশতেহারে শরিয়াহ আইন, ইসলামী রাষ্ট্র বা ইসলামী সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কোনো অঙ্গীকার নেই।
রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অর্থনীতি, ইসলামী ব্যাংকের লেনদেন এবং ইবনে সিনা ট্রাস্টের শেয়ার বিক্রি নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি।
একইসঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অর্থনীতি এবং ইসলামী ব্যাংকের লেনদেন নিয়ে ওঠা বিভিন্ন বিতর্কের কড়া জবাব দেন মন্ত্রী। দলটির ৯৩ পৃষ্ঠার নির্বাচনী ইশতেহারের কোথাও শরিয়াহ আইন, ইসলামী রাষ্ট্র বা ইসলামী বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ নেই জানিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, জামায়াত আসলে কেমন ইসলামী দল? একইসঙ্গে দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের বিভিন্ন সময়ের সুবিধাবাদী আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন।
জামায়াতে ইসলামীকে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের শাখা হিসেবে আখ্যায়িত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জামায়াতে ইসলামীর নামের সঙ্গে ইসলাম থাকলেও তাদের রাজনৈতিক ইশতেহারে এর কোনো বাস্তব প্রতিফলন নেই।
তিনি দলটির নির্বাচনী ইশতেহার সংসদে তুলে ধরে বলেন, এত সুন্দর রঙিন ইশতেহারের কোথাও শরিয়া ব্যবস্থা জারি, ইসলামী রাষ্ট্র, ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা বা ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার কথা বলা নেই।
এমনকি শিক্ষা ব্যবস্থার দফার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সেখানে কেবল মাদরাসা শিক্ষার আধুনিকায়নের কথা বলা হয়েছে, অথচ দেশের সিংহভাগ মানুষ প্রাথমিক ও সাধারণ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে।
দলটির ইতিহাস তুলে ধরে তিনি জানান, ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে প্রতিষ্ঠিত এই দলটি ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান চায়নি, আবার ১৯৭১ সালে বাংলাদেশও চায়নি। উল্টো মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশীয় দোসর হিসেবে গভর্নর মালেক সরকারের মন্ত্রিসভায় জামায়াত নেতাদের মন্ত্রী হওয়ার ইতিহাসও তিনি সংসদে স্মরণ করিয়ে দেন। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুযোগ পেয়ে পুনরায় সংগঠিত হওয়া এবং বিভিন্ন সময়ে সুবিধাবাদী জোট গঠনের অভিযোগও তোলেন তিনি।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সংসদে বিস্তারিত কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিরোধী দলের অভিযোগ খণ্ডন করে তিনি বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি, বরং অতীতের তুলনায় উন্নতি হয়েছে। এখন থানায় মামলা রেকর্ড করতে কারো হুকুম বা পরামর্শের প্রয়োজন হয় না। বিগত কয়েক মাসের অপরাধের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, দেশে যেকোনো অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশ এখন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছে।
কুমিল্লায় নিখোঁজ জিশান, চট্টগ্রামের শিশু ফারিয়া কিংবা রামিসা হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুলিশ দ্রুততম সময়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করে চার্জশিট দিয়েছে এবং বিচারকার্যে সহায়তা করছে।
সমাজে অপরাধ প্রবণতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সরকার বদ্ধপরিকর এবং মাদক ও জুয়া প্রতিরোধে যুগোপযোগী আধুনিক আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে বলেও সংসদকে আশ্বস্ত করেন তিনি।
অর্থনৈতিক বিষয়ে বলতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, ৯ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার বিশাল এই বাজেট দেশকে পরনির্ভরশীলতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে। ঋণনির্ভর বাজেটের সমালোচনা নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, পৃথিবীর সব দেশই বাজেট প্রণয়নের সময় ব্যাংক বা বিদেশি ঋণ নিয়ে থাকে। তবে সরকার রাজস্ব ব্যয়ের আকার কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর দিকেই মূল মনোযোগ দিচ্ছে।
তিস্তা প্রকল্প ও পদ্মা ব্যারেজের মতো সাহসী মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির কথাও জানান তিনি।
এছাড়া, সংসদে ইসলামী ব্যাংক ও ইবনে সিনা ট্রাস্টের শেয়ার বিক্রি নিয়ে ওঠা বিতর্কেরও কড়া জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ও অডিট রিপোর্ট তুলে ধরে তিনি জানান, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ১০ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। এটি রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি এর আগে যে দাবি করেছিলেন, তা সম্পূর্ণ সঠিক বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। একইসঙ্গে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের বিপুল পরিমাণ শেয়ার নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করার দালিলিক প্রমাণও তার হাতে রয়েছে বলে সংসদকে নিশ্চিত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ।
মতামত দিন