অভিনেতা হতে গিয়ে মার্শাল আট প্রশিক্ষক
ছোটবেলা থেকেই অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন লালন করতেন বাবুল আহমেদ রুবেল। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও নিরলস পরিশ্রমের পথ। অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন সফল অভিনেতা, দক্ষ মার্শাল আর্টিস্ট ও প্রশিক্ষক হিসেবে।
অভিনেতা হওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা মাসুম পারভেজ রুবেলের কাছে কারাতে প্রশিক্ষণ নেন। একই সঙ্গে তিনি যুক্ত হন থিয়েটারের সঙ্গে। ঢাকার স্বনামধন্য নাট্যদল ‘নবানাট’-এর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি নিয়মিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল প্রাঙ্গণে মহড়া দিতেন এবং মঞ্চনাটকের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতেন। এর আগে শৈশবে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে ‘দেশ নাট্যগোষ্ঠী’র সঙ্গে যুক্ত থেকে অসংখ্য মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন।
একজন বহুমুখী শিল্পী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে তিনি মোনা সিদ্দিক হৃদয়ের কাছে নৃত্য, গীতিকার মিল্টন খন্দকারের বড় ভাই বকুল খন্দকারের কাছে সংগীত এবং বহুমুখী অভিনেতা জনি চ্যাপলিনের কাছে ম্যাজিক শেখেন।
শৈশব থেকেই থিয়েটারে সক্রিয় থাকা রুবেল শতাধিক মঞ্চনাটকে অভিনয় করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে— যত চোর, সোনার চর, পুতুল বিয়ে, মা এবং বাংলাদেশের জনপ্রিয় কমেডি নাটক ভেলকি। ‘ভেলকি’ নাটকটি নিয়ে তিনি দেশের বিভিন্ন জেলায় ৬০টিরও বেশি মঞ্চায়নে অংশ নেন। পাশাপাশি তিনি নিয়মিত পথনাটকেও অভিনয় করেছেন।
টেলিভিশনেও রয়েছে তার শক্ত অবস্থান। তিনি শতাধিক টিভি নাটকে অভিনয় করেছেন, যা বাংলাদেশের প্রায় সব টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে। এছাড়া সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রসহ ১১টি বাংলা সিনেমায় অভিনয় করেছেন। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধানে নির্মিত নেশাখোর নামের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ১৭টি দেশে প্রদর্শিত হয়। এছাড়া ইংরেজি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ওয়ান মিলিয়ন ডলার-এ তিনি “লিটল ইমরান” চরিত্রে অভিনয় করেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি রুবেল একজন দক্ষ মার্শাল আর্টিস্ট ও প্রশিক্ষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। জাতীয় কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি একাধিকবার খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে সম্মাননা অর্জন করেছেন। ২০১০ সাল থেকে তিনি নিয়মিতভাবে চীনা মার্শাল আর্ট উশু অনুশীলন করে আসছেন।
পরবর্তীতে তিনি হবিগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, সিরাজগঞ্জ ও চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় একাধিক মার্শাল আর্ট একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রশিক্ষণে গড়ে ওঠা খেলোয়াড়রা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, তার একাডেমির কয়েকজন খেলোয়াড় বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-তে অধ্যয়নের সুযোগ পেয়েছে, যা তার প্রশিক্ষণের মান ও দক্ষতার স্বীকৃতি বহন করে।
তার প্রশিক্ষিত অনেক খেলোয়াড় হংকং, মালয়েশিয়া, দুবাই, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, কাজাখস্তান, নেপাল, জাপান ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে খেলা ও কাজের সুযোগ পেয়েছেন।
রুবেল বেড়ে উঠেছেন ক্রীড়া ও সংস্কৃতিমনস্ক একটি পরিবারে। তার ছোট বোন ছিলেন একজন উশু খেলোয়াড় এবং ছোট ভাই ছিলেন মার্শাল আর্টিস্ট। তাদের মা সবসময় চাইতেন সন্তানরা লেখাপড়ার পাশাপাশি সংস্কৃতি ও ক্রীড়ায়ও কৃতিত্ব অর্জন করুক। মায়ের সেই স্বপ্ন বুকে ধারণ করেই আজ তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষক।
বর্তমানে তিনি মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে বিভিন্ন স্কুলে কিশোর-কিশোরীদের মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ প্রদান করছেন। পাশাপাশি সরকারি শিশু পরিবারগুলোতেও নিয়মিত উশু প্রশিক্ষণ পরিচালনা করছেন।
রুবেল প্রতিষ্ঠিত ক্লাবগুলোর মধ্যে রয়েছে— হবিগঞ্জ প্রজন্ম উশু সান্ডা ফাইট ক্লাব, ঠাকুরগাঁও প্রজন্ম উশু ফাইট স্কুল, বিরগঞ্জ প্রজন্ম উশু ফাইট ক্লাব এবং ফরিদগঞ্জ প্রজন্ম উশু ফাইট ক্লাব। বর্তমানে চারটি জেলায় মোট ১১টি ক্লাবের মাধ্যমে শতাধিক খেলোয়াড় নিয়মিত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। তবে প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সরঞ্জাম ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাবুল আহমেদ রুবেলের স্বপ্ন— বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের মার্শাল আর্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেখানে ছেলে-মেয়েরা আত্মরক্ষার কৌশল শিখবে এবং মেধাবী খেলোয়াড়রা দেশ-বিদেশে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। তার চূড়ান্ত লক্ষ্য, বিশ্বমঞ্চে গর্বের সঙ্গে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করা।
তার সফলতা ও স্বপ্নপূরণের জন্য সবার দোয়া ও শুভকামনা রইল।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে