Views Bangladesh Logo

অতীতের ১৩০০ উন্নয়ন প্রকল্প বর্তমানের সরকারের জন্য বড় দায়: অর্থমন্ত্রী

বিগত সরকারের আমল থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এক হাজার ৩০০টি উন্নয়ন প্রকল্পকে বর্তমান সরকারের জন্য বড় দায় বা 'লায়াবিলিটি' হিসেবে দেখছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অবকাঠামো ও উন্নয়ন খাতের এই বিপুলসংখ্যক প্রকল্পের কাজ অর্ধেক বা তারও বেশি শেষ হয়ে যাওয়ায় এগুলো চাইলেও এখন পুরোপুরি বাতিল করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে (আইডিইবি) বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত ‘ডিবেটিং বাজেট অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন।

সেমিনারে অর্থমন্ত্রী বলেন, “বিগত সরকারের নেওয়া ১৩০০ ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। ওই প্রজেক্টগুলো আমাদের জন্য লায়াবিলিটি। কী ধরনের প্রজেক্ট আপনারা বুঝতে পারছেন। কিছু বাদ দিতে পারছি, সব বাদও দেওয়া যাচ্ছে না। অনেক প্রজেক্টের ৫০-৬০ পার্সেন্ট ইমপ্লিমেন্ট হয়ে গেছে। না ফেলতে পারছি, না গিলতে পারছি। এটা বর্তমান সরকারের বড় সমস্যা।”

বিগত ১৫ বছরে নেওয়া এসব প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, “এগুলো আসলে কোন ধরনের প্রকল্প, তা আপনারা নিশ্চয়ই খুব ভালো করেই বুঝতে পারছেন। আমরা এর মধ্য থেকে কিছু প্রকল্প বাদ দিতে পেরেছি, কিন্তু সব বাদ দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না।”

আমির খসরু বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বর্তমান সরকারকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং স্পট বায়িং বা অর্থায়নের মতো বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। তবে এর মাঝেই গতানুগতিক ফরম্যাট থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনীতিতে একটি নতুন মডেল ও চিন্তার ওরিয়েন্টেশন দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমাদের স্লোগানটাই ছিল—ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমি বা অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ। কারণ আমাদের অর্থনীতিটা বিগত বছরগুলোতে পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতিতে রূপ নিয়েছিল। শক্তিশালী ও সুসংগঠিত গোষ্ঠীগুলো সব সুবিধা পেলেও প্রান্তিক মানুষ ইকোনমিক প্ল্যানিংয়ের বাইরে থেকে গেছে। আমরা প্রান্তিক কামার-কুমার, কুটির শিল্প, তাঁতী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও গ্রামের নারীদের অর্থনৈতিক মূলধারায় আনতে চাই।”

এ সময় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘কৃষক কার্ড’ চালুর যুক্তিকতা তুলে অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কৃষকদের পক্ষে মেটানো সম্ভব হয় না। আমরা এসে দেখেছি ১০ হাজার কোটি টাকার কৃষি ঋণ মাফ করতে হয়েছে। তাই ঋণের বোঝা না চাপিয়ে সার ও বীজের মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে কৃষক কার্ড দেওয়া হচ্ছে। তবে সম্পদের সীমাবদ্ধতা (রিসোর্স কনস্ট্রেইন্ট) থাকার কারণে সরকার যতটুকু চেয়েছে ততটুকু করতে পারেনি বলেও জানান তিনি।

অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার ‘সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ (ইউনিভার্সাল প্রিভেন্টিভ হেলথ কেয়ার) নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি, মৃৎশিল্প বা তাঁতশিল্পকে ব্র্যান্ডিং ও অ্যামাজন-ইবের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত করে সৃজনশীল অর্থনীতির (ক্রিয়েটিভ ইকোনমি) মাধ্যমে জিডিপিতে অবদান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের মিউজিক, থিয়েটার ও ফিল্মকে বাণিজ্যিকভাবে সফল (মনিটাইজ) করতে পূর্বাচলে একটি 'থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট' গড়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও অত্যন্ত হতাশাজনক উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বড় ঋণের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে। পুঁজিবাজারের জন্য সম্পূর্ণ পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়ে একটি নতুন কমিশন গঠন করা হয়েছে, যেখানে কোনো রাজনৈতিক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। কর ও আইনি সংস্কারের খবর পেয়ে ইতিমধ্যে জেপি মরগ্যানসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফান্ড ম্যানেজাররা বাংলাদেশে বিনিয়োগে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছেন, যা দেশের ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমির স্বপ্নপূরণে বড় ভূমিকা রাখবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সরকারকে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ (ডেট) পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে ফিসক্যাল স্পেস বা আর্থিক সক্ষমতার জায়গা সংকুচিত হয়ে এসেছে। তা সত্ত্বেও আগামীতে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির বড় লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের।

প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা আনতে প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের তদারকিতে এবার ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্ব-স্ব মন্ত্রীদের অফিস এবং আইএমইডিতে (মূল কপিতে 'আইএস' ছিল, যা দাপ্তরিক নাম অনুযায়ী 'আইএমইডি' হিসেবে সংশোধন করা হলো) এই ড্যাশবোর্ড থাকবে। প্রতিদিন প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি সরাসরি মনিটর করা হবে। কোথাও কাজের গতি থমকে গেলে সঙ্গে সঙ্গে ড্যাশবোর্ডে তা ফ্ল্যাশ করবে এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে এর জবাবদিহি করতে হবে।

বাজেটের শতভাগ না হলেও অন্তত ৮০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারলে দেশের প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন অর্থমন্ত্রী।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহর সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সমিতির সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।

সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন। এছাড়া আলোচনায় আরও অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শারমিন্দ নীলোর্মি, বিআইডিএসের সিনিয়র গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল এবং বুয়েটের মানবিক বিভাগের অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক ড. নাজমুল ইসলাম।


মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ