Views Bangladesh Logo

আল জাজিরার প্রতিবেদন

সম্পর্কের বরফ গলছে, বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব কমাচ্ছে ভারত

 VB  Desk

ভিবি ডেস্ক

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু ঘিরে ভারত ও বিএনপির মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরিতায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে নয়াদিল্লি ও বিএনপির সম্পর্ক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করছে।

গত ৩০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। তার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসা আঞ্চলিক নেতাদের মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও উপস্থিত ছিলেন। পরদিন শোকাহত পরিবেশে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে জয়শঙ্কর তারেক রহমানের হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো একটি সমবেদনার চিঠি তুলে দেন।

পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জয়শঙ্কর লেখেন, ভারত সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে এবং খালেদা জিয়ার দর্শন ও মূল্যবোধ ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে দিকনির্দেশনা দেবে—এমন আশাবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য দীর্ঘদিনের সম্পর্কের অবস্থান থেকে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

দীর্ঘ সময় ধরে নয়াদিল্লি খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবস্থান ও বিএনপির রাজনীতিকে সন্দেহের চোখে দেখেছে। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর জোট, পাকিস্তানমুখী রাজনীতি এবং ভারতবিরোধী অভিযোগের কারণে ভারত ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকেই ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করেছে।

তবে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত ও বিএনপি উভয়েই পারস্পরিক দূরত্ব কমিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির আল জাজিরাকে জানান, জয়শঙ্কর ও তারেক রহমানের বৈঠক ছিল অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ এবং তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে একটি নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের পতনের পর বাংলাদেশে তীব্র ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় এবং তাকে ফেরত না দেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন আরও বেড়েছে। একপর্যায়ে উভয় দেশ সাময়িকভাবে ভিসা কার্যক্রমও স্থগিত করে।

এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। বিশ্লেষকদের মতে, সেই রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে বিএনপি এগিয়ে আসছে। দলটি জামায়াতের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। অন্যদিকে জামায়াত ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের গড়া একটি দলের সঙ্গে জোট গঠন করেছে। নির্বাচনের মাঠে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী জোটকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভারতের দৃষ্টিতে জামায়াতের রাজনীতি ও পাকিস্তানঘনিষ্ঠ অবস্থান অগ্রহণযোগ্য হলেও, তারেক রহমান সাম্প্রতিক বক্তব্যে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের অঙ্গীকার করে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য বার্তা দিয়েছেন।

দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে তারেক রহমান বলেছেন, তিনি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চান যেখানে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপদ থাকবে। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও ঢাকায় সাবেক হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা মন্তব্য করেছেন, নির্বাসনকালীন সময়ে তারেক রহমান রাজনৈতিকভাবে আরও পরিণত হয়েছেন।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সময় ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক বাণিজ্য, সীমান্ত, নদীর পানি বণ্টন, নিরাপত্তা ও সংখ্যালঘু নির্যাতন ইস্যুতে উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। ভারত তখন অভিযোগ করেছিল, বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আশ্রয় পাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার সে সময় এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।

তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি ভিন্ন। খালেদা জিয়ার অসুস্থতার সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শুভকামনা এবং বিএনপির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। ভারতের কাছে এখন তারেক রহমানকে তুলনামূলকভাবে ‘সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, অতীতের জটিলতা সত্ত্বেও বাস্তবতার কারণেই নয়াদিল্লি তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে।

তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে স্থায়ী পরিবর্তন আসবে না। তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, নতুন করে শুরু করতে হলে অতীত থেকে স্পষ্ট বিচ্ছেদ প্রয়োজন। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে ভবিষ্যৎ সরকারও ভারতের ওপর চাপ বজায় রাখবে বলেও জানান তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাংলাদেশে পাকিস্তানঘনিষ্ঠ বা ভারতবিরোধী তৎপরতা ঠেকানো। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোই তাদের মূল লক্ষ্য। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক ব্যক্তিনির্ভর না হয়ে জনগণের সম্পর্ক হিসেবে পুনর্গঠন করাই তাদের উদ্দেশ্য।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ