Views Bangladesh Logo

শ্রীলঙ্কার প্রেক্ষিত বিবেচনায় বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি

করোনাকালীন অর্থনীতির চরম বিপর্যয়ের মুখে শ্রীলঙ্কান সরকার নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল। এক পর্যায়ে বিক্ষোভের মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে ক্ষমতা গ্রহণ করেন তার ছোট ভাই রনিল বিক্রমাসিংহে। তিনি ক্ষমতা নিয়েই শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর করেন পি নন্দলাল বীরাসিংহকে। ফলে নতুন প্রেসিডেন্ট এবং গভর্নরের যৌথ উদ্যোগে শ্রীলঙ্কার পতনশীল অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন শুরু হয়।


সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশ থেকে গৃহীত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেছে, শ্রীলঙ্কায় বিদেশিরা বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসছে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে, খাদ্যপণ্যের দাম কমতির দিকে, রিজার্ভ ঊর্ধ্বমুখী, মূল্যস্ফীতির হার ১ দশমিক ৩ শতাংশ, পর্যটন খাত চাঙ্গা, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বেড়েছে, শিল্প ও কৃষি উৎপাদন বাড়ার সাথে সাথে রপ্তানি বাড়ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের পেছনে যার ভূমিকা সর্বাধিক, তিনি হচ্ছেন কেন্দ্রিয় ব্যাংকের গভর্নর পি নন্দলাল বীরাসিংহ। শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনে অনুসৃত কলাকৌশল এবং নীতিমালা আমাদের দেশে বাস্তবায়নের তাগিদ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা গভর্নরের সাথে বৈঠক করে নানাবিধ পরামর্শও দিচ্ছেন।


শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। গৃহযুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পর শুরু হয় করোনা। করোনার সময় রপ্তানি, রেমিট্যান্স এবং পর্যটন খাতে আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেলে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এতে বাধ্য হয়ে সরকার নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধে বিরত থাকে। তখন কাগজের অভাবে স্কুল পর্যায়ের পরীক্ষা বাতিল করতে হয়, জ্বালানি তেলের তীব্র সঙ্কটে পেট্রোল পাম্পগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হয়, জ্বালানির তেলের অভাবে রাস্তায় বাতি জ্বলেনি, ভোজ্য তেলের অভাবে উনুনে রান্না চড়েনি, বিদ্যুৎ না থাকায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কলকারখানা, সার এবং কীটনাশক ব্যবহার নিষিদ্ধ করায় চালের উৎপাদন হ্রাস পায় ২০ শতাংশ, ভ্যাট এবং কর হার হ্রাস করায় রাজস্ব আয় কমে যায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। এই অবস্থায় শ্রীলঙ্কায় জিনিসপত্রের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরেও মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬৯ দশমিক ৮ শতাংশ। এই পরিস্থিতি থেকে শ্রীলঙ্কার বেরিয়ে আসার সংবাদ আমাদের আশান্বিত করে তুলছে।


বাংলাদেশের অর্থনীতি কখনো শ্রীলঙ্কার মতো হয়নি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে করোনাকালীন নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির তুলনায় বাংলাদেশে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিশ্ব বাজারে জিনিসপত্রের দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমান্বয়ে কমলেও এখনো স্বস্তিদায়ক মজুত রয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট মাসে ভারতের রিজার্ভ ছিল ৬০১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, শ্রীলঙ্কার ৩ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার, পাকিস্তানের ১২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশের ২৯ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। অবশ্য আইএমএফের ম্যানুয়াল অনুযায়ী ২১ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। আমাদের রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রদত্ত প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার ঋণকে আইএমএফ রিজার্ভের স্থিতি হিসেবে গণ্য করতে নারাজ। অথচ ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ হচ্ছে। রিজার্ভ শুধু বাংলাদেশের কমছে না, ভারত-শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানেরও কমছে।


আজকাল বিভিন্ন পত্রিকা পড়লে মনে হয়, রিজার্ভ কমার সাথে সাথে দেশের অর্থনীতি শেষ হয়ে যাচ্ছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের কোনো বৈদেশিক মুদ্রাই ছিল না, দেশ কি চলেনি? কিছুদিন আগে শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তানেরও কোনো বৈদেশিক মুদ্রা ছিল না। শূন্য রিজার্ভ নিয়ে শ্রীলঙ্কা এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। পাকিস্তানের রিজার্ভ এক সময় ১ দশমিক ৯৭ বিলিয়নে নেমে এসেছিল। তাদের রিজার্ভ এখনো আমাদের রিজার্ভের অর্ধেক। এই রিজার্ভের উপর ভর করে পাকিস্তানের অর্থনীতি আবার সতেজ হচ্ছে। ২০০৮ সালে আমাদের রিজার্ভ ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার এবং ২০১১ সালে ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছলে গভর্নর ড. আতিউর রহমান কেক কেটে তা উদযাপন করেন, আমিও সেই উদযাপনের অংশীদার ছিলাম। রিজার্ভ খরচ না করলে উন্নয়ন থেমে যাবে, জিনিসপত্রের দাম আরও বেড়ে যাবে।


বাংলাদেশে কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বেড়েছে, রপ্তানি বেড়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, যোগাযোগ অবকাঠামোর অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। এই সকল প্রবৃদ্ধির মধ্যে কমেছে রেমিট্যান্স, বেড়েছে আমদানি ব্যয়, বিদেশ থেকে একই জিনিস আমাদের কিনতে হচ্ছে দ্বিগুণ দামে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রভাব পড়ায় মূল্যস্ফীতি ঘটে। দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত কৃষিজাত পণ্যের দামও বাড়তে থাকে; কচু, লতি ও কাঁচা মরিচের সাথে জ্বালানি তেলের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক না থাকলেও এগুলোর পরিবহন খরচ বেড়েছে এবং এগুলো বেশি দামে বিক্রি না করলে এই সকল পণ্যের উৎপাদক বেশি দামের অন্যান্য জিনিস কিনবে কি করে? তাই কচু, লতির দাম বাড়া অস্বাভাবিক নয়।


বাংলাদেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও পাকিস্তান, তুরস্ক, শ্রীলঙ্কার মতো ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়নি। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ ১০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল এবং এখনো আছে। পৃথিবীর কয়েকটি দেশে করোনা উত্তর মূল্যস্ফীতি কমে গেলেও বাংলাদেশে কমেনি। অবশ্য এটাও বিবেচ্য, যে সকল দেশ জিনিসপত্রের দাম কিছুটা কমাতে সক্ষম হয়েছে তাদের মূল্যস্ফীতি ছিল আকাশচুম্বী, আমাদের মতো ১০ শতাংশ ছিল না। এখনো কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি। শ্রীলঙ্কার অগ্রগতি ও সফলতার কাহিনী মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে কিন্তু তাদের বিপর্যয় এখনো কাটেনি। তবে পরিস্থিতি গত বছর যতটা খারাপ ছিল, এই বছর ততটা নয়।


গত বছর শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির সংকোচন ছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। চলতি বছরেও অর্থনীতির সংকোচন হবে। আগামী বছর কিছুটা প্রবৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। রাজস্ব ও মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে নতুন সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নতুন ও উপযোগী নীতির প্রয়োগ করেছেন। প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ের উৎখাতের পর নতুন সরকার দ্বিগুণ হারে কর আরোপ করেছে, জ্বালানি খাত থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করেছে, জ্বালানির দাম কয়েক দফায় বাড়িয়েছে। এ ছাড়াও সরকার প্রশাসনিক খাতে ব্যয় কমিয়েছে, ভর্তুকি কমিয়েছে, কর হার বৃদ্ধি এবং করজাল বিস্তৃত করেছে, কৃষি উৎপাদনে রাসায়নিক সার কীটনাশকের ব্যবহার পুনরায় শুরু করেছে।


শ্রীলঙ্কান সরকার অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে গত বছর ৩ লাখ ১১ হাজার শিক্ষিত ও দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠাতে সমর্থ হয়েছে। সেই সঙ্গে শস্যের ভালো ফলনের ভূমিকাও রয়েছে। সরকারের এই সকল সংস্কারের সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি কোনো যোগসূত্র নেই। তাই শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে এককভাবে মহিমান্বিত করার যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। চলতি বছরের এপ্রিল ও মার্চে শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার বাড়িয়েছিল ১ হাজার ৫০ বেসিস পয়েন্ট বা সাড়ে ১০ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি কমার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে এবং তা হলো মুদ্রার একক বিনিময় হারের প্রবর্তন ও মুদ্রার বিনিময় হার বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ন, যা রেমিট্যান্স প্রেরণে প্রবাসীদের উদ্বুদ্ধ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উক্ত দুইটি নীতির সফল বাস্তবায়নে মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরা সম্ভব হয়েছে। তবে শ্রীলঙ্কার মূল্যস্ফীতির হার কমার পেছনে ভিত্তি বছর পরিবর্তনের প্রভাবও রয়েছে; মূল্যস্ফীতির ভিত্তিবছর ২০১৩ সালের স্থলে ২০২১ সাল করা হয়েছে। এ ছাড়াও পর্যটন, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি খাতে আয় বৃদ্ধির কারণে রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে। রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণে শ্রীলঙ্কার মুদ্রার দর বেড়েছে, রুপির দর বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় কমেছে, আমদানি ব্যয় কমার কারণে মূল্যস্ফীতি কমেছে।


গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে পর্যটন খাতে ২৫ শতাংশ, রেমিট্যান্স খাতে ৭৬ শতাংশ, উৎপাদন খাতে ৭ শতাংশ। প্রবাসীদের অর্থ প্রেরণে প্রনোদনা দেওয়া হচ্ছে। অর্থনীতির এইরূপ দৃশ্যমান অগ্রগতির প্রধান কারণ করোনার অবসান এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভুল নীতির প্রবক্তা গোতাবায়া সরকারের উৎখাত। সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কার কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন আইএমএফ-কে ঋণ প্রদানে উদ্বুদ্ধ করেছে। আইএমএফ থেকে ঋণ পাওয়ার পর শ্রীলঙ্কার উপর ঋণদাতা ও ব্যবসায়িক অংশীদার দেশগুলোর আস্থা বেড়ে গেছে, যার ফলশ্রুতিতে রপ্তানি বেড়েছে। পর্যটনের মতো কিছু ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় পুনরুদ্ধার হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কিছুই করতে হয়নি।


শতভাগ শিক্ষিত মানুষের এই দেশটির স্থিতিশীল অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল পর্যটন। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়িয়ে বাজার থেকে মুদ্রা তুলে নিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও একক বিনিময় হার প্রবর্তন ও নীতি সুদহার বৃদ্ধি করেছে। সুদহার বাড়ানোর কারণে টাকার দাম বৃদ্ধি এবং ডলারের চাহিদা হ্রাস পাওয়ার কথা কিন্তু আমাদের দেশে এই ফর্মূলায় কাজ হয়নি। না হওয়ার প্রধান কারণ সম্ভবত ঋণ নিয়ে ফেরত দিতে হয় না বলে বর্ধিত সুদহার ব্যবসায়ীদের কাছে গুরুত্বহীন। অন্যদিকে সহজ শর্তে ঋণের পুনঃতফসিলীকরণের সুবিধা থাকায় ব্যবসায়ীদের নতুন ঋণ গ্রহণ ও অনবচ্ছিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে না। এই অবস্থায় ব্যবসায়ীরা ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করে পুনঃতফসিলের ডাউন পেমেন্ট দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে।


মূল্যস্ফীতি না কমার আরেকটি কারণ হচ্ছে, আমাদের রপ্তানি আয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ। আমদানি ব্যয় বেশি হওয়ায় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিন দিন কমছে। রিজার্ভের উপর চাপ কমাতে গিয়ে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে, আমদানি নিয়ন্ত্রণ করার কারণে বাজারে পণ্য-ঘাটতির উদ্ভব হচ্ছে এবং বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য ঘাটতি থাকায় দাম বাড়ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সিণ্ডিকেট হচ্ছে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির জোটবদ্ধ কূটকৌশল, যা অপরাধ পদবাচ্য। বাজার ব্যবস্থাপনা আর বাজার নিয়ন্ত্রণ এক জিনিস নয়। যথাসময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্য বাজারে যোগান দেয়ার ব্যবস্থা নেই বলেই বাজার এখন বিক্রেতার অনুকূলে। তাই শ্রীলঙ্কার মতো সুদহার বৃদ্ধি করে বাজার থেকে টাকা উঠিয়ে নিয়ে ক্রেতার ক্রয় ক্ষমতা কমানোই মূল্যস্ফীতি হ্রাসের একমাত্র পথ।


সম্ভবত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্ধিত নীতি সুদহার এবং সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকার কৃচ্ছ্রসাধনে কিছুটা উদাসীন। বিভিন্ন খোঁচায়ও সরকারের চেতনা জাগ্রত হয় না। রাজস্ব আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ানো সম্ভব না হওয়ায় মূল্যস্ফীতি রোধে সরকারকে অবশ্যই ব্যয় কমাতে হবে। সরকারের বাহুল্য ব্যয় কমানো না গেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্ধিত নীতি সুদহারের সফল বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। প্রকল্পের সংখ্যা না কমিয়েও প্রকল্প ব্যয় হ্রাস করে উন্নয়নের গতি অনবচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব।


অহর্নিশ অভিযোগ উঠছে যে প্রায় অভিন্ন বা একই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন দেশে কম খরচ হলেও বাংলাদেশে খরচ হচ্ছে অনেক বেশি। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে অধিক হারে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রয়োজন না হলে নতুন নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার দরকার কি? এই সকল অভিযোগের কোনো যুৎসই উত্তর নেই, নিশ্চুপ। এখনো বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা থেকে কর্মকর্তারা অহর্নিশ বিদেশ ভ্রমণ করছেন। কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যেই জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের জন্য ৩৮০ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় ২৬১টি জিপ কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। রাজস্ব আয় বাড়ানোর তাৎপর্যপূর্ণ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।


আমাদের মনে রাখতে হবে, শ্রীলঙ্কা তাদের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য বাড়াতে না পারায় আইএমএফ তাদের দ্বিতীয় কিস্তির ঋণ আটকে দিয়েছে। মিডিয়ার অতি নেতিবাচক প্রচারে ডলারের দাম স্থিতিশীল হচ্ছে না, বাজারে পণ্যমূল্য কমছে না, সিণ্ডিকেট তৈরি হচ্ছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণের চেয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো অধিক জরুরি। সরকারের ব্যাপক উন্নয়নের সফলতা মূল্যস্ফীতির চাপে বিস্মৃতির অতল গহ্বরে ডুবে যাচ্ছে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ নীতি সুদহার প্রয়োগ করে ঋণ প্রাপ্তিকে ব্যয়বহুল করে তোলার পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। মূল্যস্ফীতি সহনীয় মাত্রায় নেমে গেলে কয়েক মাস পর নীতি সুদহার কমিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ করা শ্রেয় হবে।


লেখক:  সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টাকশাল

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ