মুক্তচিন্তার প্রতীক হুমায়ুন আজাদের ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
বাংলা সাহিত্য ও ভাষাবিজ্ঞানে স্বতন্ত্র চিন্তার ছাপ রেখে যাওয়া প্রথাবিরোধী লেখক, ভাষাবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৪ সালের ১২ আগস্ট জার্মানির মিউনিখে মারা যান তিনি। মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ ও প্রচলিত সামাজিক কাঠামোর সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের কারণে বাংলা সাহিত্যে তিনি তৈরি করেছিলেন আলাদা এক অবস্থান।
১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল বিক্রমপুরের কামারগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ুন আজাদ। তার নাম ছিল হুমায়ুন কবীর, যা ১৯৮৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পরিবর্তন করে হুমায়ুন আজাদ রাখেন। তার বাবার নাম আবদুর রাশেদ এবং মায়ের নাম জোবেদা খাতুন। হুমায়ুন আজাদ মূলত ভাষা নিয়ে কাজ করেছেন। তার শিশুতোষ গ্রন্থগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিশোর সাহিত্য ও উপন্যাসের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন সফল। ভাষাবিজ্ঞানী ও গদ্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত হলেও তিনি আমৃত্যু কাব্যচর্চা করে গেছেন।
আশির দশকের শেষভাগ থেকে সমসাময়িক ও রাজনৈতিক বিষয়ে গণমাধ্যমে লেখালেখি ও বক্তব্য দিতে শুরু করেন হুমায়ুন আজাদ। সাপ্তাহিক ‘খবরের কাগজ’ পত্রিকায় সামরিক শাসনের বিরোধিতা করে তার রাজনৈতিক লেখালেখির সূত্রপাত হয়। তার লেখায় ধর্ম, মৌলবাদ, প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা, যৌনতা, নারীবাদ ও রাজনীতি গুরুত্ব পেয়েছে, যা পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০১২ সালে সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম ও ভাষাবিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্য মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন।
তাঁর ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ উপন্যাস প্রকাশের পর মৌলবাদী গোষ্ঠীর তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েন হুমায়ুন আজাদ। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে একদল সন্ত্রাসী তাঁর ওপর হামলা চালায়। চাপাতির আঘাতে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ২২ দিন এবং ব্যাংককে ৪৮ দিন চিকিৎসা নেন এই লেখক।
চিকিৎসা শেষে গবেষণার কাজে ২০০৪ সালের ৭ আগস্ট জার্মানিতে যান হুমায়ুন আজাদ। কিন্তু সেখানে যাওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মিউনিখের নিজ বাসা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু তখন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। হামলার পর তাঁর ছোট ভাই মঞ্জুর কবির রমনা থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেছিলেন। পরে লেখকের মৃত্যুর পর সেটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১২ সালের ৩০ এপ্রিল পাঁচজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ। ওই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্তে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ বা জেএমবির সদস্যদের হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে আসে।
প্রায় এক দশক ধরে চলা বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২২ সালের ১৩ এপ্রিল হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলায় চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন জেএমবির শূরা সদস্য মিজানুর রহমান ওরফে মিনহাজ, আনোয়ার আলম ওরফে ভাগনে শহীদ, সালেহীন ওরফে সালাহউদ্দিন এবং নূর মোহাম্মদ ওরফে সাবু। তাঁদের মধ্যে মিনহাজ ও আনোয়ার কারাগারে রয়েছেন, আর সালাহউদ্দিন ও নূর মোহাম্মদ পলাতক। পরে মামলার নথি আপিল শুনানির জন্য হাইকোর্টে পাঠানো হলেও এরপর আর দৃশ্যমান অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি।
মামলার বর্তমান অবস্থা নিয়েও হুমায়ুন আজাদের পরিবারের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাঁর মেয়ে লেখক মৌলি আজাদ জানিয়েছেন, উচ্চ আদালতে মামলাটির শুনানি হবে কি না কিংবা নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় শেষ পর্যন্ত কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে তাঁরা সন্দিহান। ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল বিক্রমপুরের কামারগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া হুমায়ুন আজাদ সাহিত্য ও ভাষাবিজ্ঞানে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। মৃত্যুর পর ২০১২ সালে সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম ও ভাষাবিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্য তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
মতামত দিন