Views Bangladesh Logo

দেশে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে ব্যাংকাররা কতটা দায়মুক্ত?

M A  Khaleque

এম এ খালেক

দেশের ব্যাংকিং খাত নানা সমস্যায় জর্জরিত। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব এবং বিদ্যমান পর্বত প্রমাণ খেলাপি ঋণের উপস্থিতি। সুশাসনের অভাব এবং খেলাপি ঋণের প্রবল উপস্থিতি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। একটির কারণে অন্য সমস্যাটি সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান মোতাবেক, দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর মোট ছাড়কৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ৯৮ কোটি টাকা। এক পর্যায়ে কিছু দিন আগে খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটিতে উন্নীত হয়েছিল। সেটাই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের রেকর্ড। অবশ্য আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ এবং স্থানীয় অর্থনীতিবিদদের অধিকাংশই বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান বিশ্বাস করছে না।

 

যেকোনো দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করা যায়। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কোনোভাবেই সহনীয় পর্যায়ে নেই। গত শতাব্দির আশির দশকে বিশ্ব ব্যাংকের উদ্যোগে ব্যাংকিং খাতে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হলে প্রথমবারের মতো খেলাপি ঋণের বিষয়টি আলোচনায় চলে আসে। জাতীয় পার্টির শাসনামলের শেষের দিকে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। তারপর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারগুলো দায়িত্ব পালনের সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ শুধু বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন সময় অর্থমন্ত্রীরা খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য নানা ধরনের অঙ্গীকার করেছেন। কিন্তু সবই অরণ্যে রোদন মাত্র। অর্থমন্ত্রীরা একাধিকবার ঋণ খেলাপির তালিকা জাতীয় দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ঋণ খেলাপিরা বুঝে গেছে, যে সরকার তাদের আসলে কিছুই করবে না। তাই তারা কোনোভাবেই ঋণের কিস্তি ফেরত দেবার ব্যাপারে আগ্রহী হচ্ছে না।


ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) কয়েক মাস আগে বাংলাদেশের আবেদনের প্রেক্ষিতে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে। এই ঋণের বিপরীতে যেসব সংস্কার কার্যক্রমের শর্তারোপ করা হয়েছে তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে ব্যাংকিং খাতে অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আইনি সংস্কার ও অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ সহনীয় মাত্রায় কমিয়ে আনা।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করে তা আইএমএফ মোটেও মানতে রাজি নয়। সংস্থাটি অনেকবারই বলেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখাচ্ছে। তাই তাদের পরিসংখ্যান মোটেও বিশ্বাসযোগ্য এবং তথ্যভিত্তিক নয়। ব্যাংকিং সেক্টরের প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রদর্শিত পরিমাণের চেয়ে অন্তত ৩ গুণ বেশি হবে। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক অবলোপনকৃত ঋণ হিসাবের নিকট পাওনা বিরাট অঙ্কের ঋণ, পুনঃতফসিলকৃত ঋণ হিসাবের নিকট পাওনা ঋণ এবং মামলাধীন প্রকল্পের নিকট পাওনা ঋণাঙ্ক খেলাপি ঋণ হিসেবে প্রদর্শন করছে না। স্থানীয় অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বিভিন্নভাবে যেসব খেলাপি ঋণের কিস্তি আদায় না করেও নানা প্রক্রিয়ায় খেলাপিমুক্ত দেখানো হচ্ছে তা একত্রিত করলে খেলাপি ঋণের সার্বিক পরিমাণ ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা হবে। আমারা খেলাপি ঋণের পরিমাণ কত তা নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কে না গিয়ে খেলাপি ঋণ কেন সৃষ্টি হচ্ছে তা নিয়ে বাস্তবতার নিরিখে আলোচনার চেষ্টা করব। এই অলোচনা থেকে প্রতীয়মান হবে যে, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কালচারের জন্য প্রকৃত পক্ষে কী কারণ দায়ী এবং কোন 
খেলাপি  ঋণের কিস্তি বাংকগুলো আদায় করতে পারছে না।

 

আমি দীর্ঘ ৩৪ বছর একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে কর্মরত ছিলাম। এই সময়ে আমি প্রত্যক্ষ করেছি, আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতের ঋণ খেলাপিরা কত শক্তিশালি এবং তারা কীভাবে ব্যাংক কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে তাদের স্বার্থ হাসিল করে নেন। আমরা খেলাপি ঋণের প্রসঙ্গ এলেই ঢালাওভাবে ঋণ গ্রহীতাদের দায়ী করে থাকি। যেন তাদের কারণেই ব্যাংকিং খাত খেলাপি ঋণ জর্জরিত হয়ে পড়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তারা যেন ‘ধোয়া তুলসি পাতা’। কিন্তু একটি কথা মনে রাখতে হবে, কোনো সময়ই ‘এক হাতে তালি বাজে না।’ তেমনি শুধু ঋণ গ্রহীতাদের আচরণের কারণে ঋণ খেলাপি কালচার সৃষ্টি হয় না। ঋণ গ্রহীতা এবং ব্যাংকের এক শ্রেণির অসৎ কর্মকর্তা প্রত্যক্ষভাবে খেলাপি ঋণ কালচারের জন্য দায়ী। ঋণ খেলাপিরা সাধারণত দুই শ্রেণির। একটি শ্রেণি ঋণ গ্রহণের পর নানা কারণে ইচ্ছা থাকা সত্বেও নির্ধারিত সময়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারেন না। এরা প্রকৃত ঋণ খেলাপি। এদের যদি আর্থিকসহ নানা ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয় তাহলে তারা আবারো ঋণের কিস্তি পরিশোধে তৎপর হবেন। আবার এক শ্রেণির ঋণ খেলাপি আছেন যারা ঋণের কিস্তি পরিশোধের সামর্থ্য থাকা সত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণের কিস্তি আটকে রাখেন। এরাই ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি। ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিরা অত্যন্ত পাওয়ারফুল। তারা সব সময়ই ক্ষমতাসীন সরকারি দলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেন অথবা সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে তাদের স্বার্থ উদ্ধার করে থাকেন। এদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ব্যাংকিং আইনগুলো এমনভাবে প্রণীত হয় যেন তা ঋণ খেলাপিদের স্বার্থ রক্ষা করে।

 

সম্প্রতি ব্যাংকিং কোম্পানি আইনে এমন কিছু পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে যাতে খেলাপি ঋণের কিস্তি আদায় না করেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ কৃত্রিমভাবে কম দেখানো যায়। একজন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ এই অবস্থাকে ‘কার্পেটের নিচে ময়লা রেখে ঘর পরিস্কার দেখানো প্রচেষ্টা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। আগে কোনো ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ করতে হলে মোট পাওনার ১০ শতাংশ একবারে ব্যাংকে ডাউন পেমেন্ট হিসাবে প্রদান করতে হতো। দ্বিতীয়বার ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের জন্য ১২ শতাংশ এবং তৃতীয়বার পুনঃতফসিলিকরণের জন্য ৩০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিতে হতো। এখন ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে এক বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ করা যাচ্ছে। আগে কোনো ঋণ হিসাব অবলোপন করতে হলে একটি ঋণ হিসাব ‘মন্দমানে শ্রেণিকৃত’ হবার পর ৫ বছর অতিক্রান্ত হলে উপযুক্ত আদালতে মামলা দায়ের এবং শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করে সেই ঋণ হিসাব অবলোপন করা যেত। এখন একটি ঋণ হিসাব মন্দমানে শ্রেণিকৃত হবার পর তিন বছর অতিক্রান্ত হলেই তা অবলোপন করা যাচ্ছে। ৫ লাখ টাকার কম পাওনা সম্বলিত ঋণ হিসাব অবলোপন করার জন্য মামলা দায়ের করতে হয় না। শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণের শর্তও বাতিল করা হয়েছে। ঋণ হিসাব শ্রেণিকরণের সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে। ফলে এখন আর সহজে কোনো ঋণ হিসাব খেলাপি হচ্ছে না।

 

বাধের উজানে কেউ যদি পানি ঘোলা করে তাহলে নিচের দিকে ঘোলা পানিই প্রবাহিত হবে। তাই আমরা নিচের দিকে পরিস্কার পানি পেতে চাই তাহলে প্রথমেই আমাদের বাধের উজানে অবস্থান করে যিনি পানি ঘোলা করছেন তাকে সরিয়ে দিতে হবে। তা হলেই নিচে পরিস্কার পানি পাওয়া যাবে। তেমনি আমরা যদি ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে চাই তাহলে প্রথমেই খেলাপি ঋণ সৃষ্টির কারণগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে তা দূরীকরণের জন্য আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণের কারণ নানাভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করি। কিন্তু ঋণ প্রদানের জন্য সবচেয়ে ক্ষমতাবান বা দায়িত্বশীল ব্যাংক কমকর্তাদের ব্যাপারে কিছুই বলি না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, ব্যাংক কর্মকর্তারা যেন ধোয়া তুলসী পাতা। তারা ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানেন না। কিন্তু কিছু অসৎ ব্যাংকারদের সহায়তা না পেলে একটি ঋণ হিসাব খেলাপি হওয়া সহজ নয়। আমি এখানে ব্যাংকের সৎ এবং ভালো কর্মকর্তাদের প্রসঙ্গ আলোচনায় আনছি না। এখনো ব্যাংকিং খাতে অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা ব্যাংকটিকে নিজের জীবনের মতোই ভালোবাসেন। কিন্তু তারা অসৎ কর্মকর্তাদের দাপটের নিকট বড়ই অসহায়।

 

একজন উদ্যোক্তা বা সাধারণ ঋণ প্রত্যাশী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যখন কোনো ব্যাংকে ঋণ গ্রহণের জন্য আসেন প্রথমেই তাকে ব্যাংকের শাখা ম্যানেজারের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়। একজন শাখা ম্যানেজার যদি সৎ এবং ব্যাংকের স্বার্থের প্রতি একনিষ্ঠ হন তাহলে তিনি প্রাথমিক আলোচনাতেই বুঝতে পারবেন যিনি ঋণের জন্য আবেদন নিয়ে এসেছেন তিনি কেমন মানুষ। তাকে ঋণ দিলে তা ফেরৎ আসার সম্ভাবনা কতটুকু। অসৎ ঋণ গ্রহীতারা ব্যাংকে আসার পর নানাভাবে ম্যানেজারকে বুঝাতে চেষ্টা করেন যে তাকে ঋণ দেওয়া হলে ম্যানেজারের ইচ্ছে পূরণ হবে। ঋণ অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে জামানত হিসেবে সম্পদ বন্ধক গ্রহণ করা হয়। এই জামানতের হার হচ্ছে ১০০:১২৫ অথবা ১০০:১৫০। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ১০০ কোটি টাকা ঋণ প্রদান করা হলে ব্যাংক তার নিকট থেকে ১২৫ কোটি অথবা ১৫০ কোটি টাকার সম্পদ বন্ধক রাখবে। এখানেই খেলাপি ঋণের প্রথম খেলা শুরু হয়। যদি ম্যানেজার দুর্নীতিবাজ এবং অসৎ হন তাহলে তিনি এই বন্ধকীকৃত সম্পদের অতি মূল্যায়ন করতে সাহায্য করতে পারেন ঋণ আবেদনকারীকে। তিনি কর্মকর্তাদের দিয়ে প্রস্তাবিত বন্ধকী সম্পত্তি, যার মূল্য হয়তো ১ কোটি টাকা তা তিনি ৫ কোটি টাকাও মূল্য দেখাতে পারেন। ম্যানেজার তার একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট নিয়ে বন্ধকী সম্পদ মূল্যায়ন করতে যান। ঋণ আদেনকারীকে আগেই বলে দেওয়া হয় কোন তারিখে তিনি সম্পদ মূল্যায়ন করতে যাবেন। ঋণ আবেদনকারী তার নিজস্ব লোকজন সম্পত্তি এলাকায় নিয়ে জমা করে রাখেন। ম্যানেজার তাদের প্রশ্ন করলে তারা সম্পদের মূল্য অনেক বাড়িয়ে বলেন। অবশ্য ঋণের অঙ্ক যদি বেশি হয় তাহলে ব্যাংকের তালিকাভুক্ত ভ্যালুয়েশন ফার্ম দিয়েও সম্পদের মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু এই ভ্যালুয়েশন ফার্মের কর্মকর্তাদের পক্ষেও ম্যানেজারের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে সঠিক মূল্যায়ন করা সম্ভব হয় না। কারণ তা করা হলে ফার্মের বিল পেতে সমস্যা হবে। ভবিষ্যতে আর সেই ব্যাংকের কোনো কাজ পাবেন না।

 

বন্ধকীযোগ্য সম্পদের ভ্যালুয়েশন কীভাবে বেশি করা হয় তার একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। আমি তখন একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের কারওয়ানবাজার আঞ্চলিক অফিসের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের আশুগঞ্জ শাখা থেকে একটি ঋণ মঞ্জুুর করা হয় ২০ লাখ টাকার। সেই ঋণের বিপরীতে ৬৩ লাখ টাকার সম্পদ বন্ধক রাখা হয়। তিন বছর পর আরও একটি পরিদর্শক টিম ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট সম্পদ ভ্যালুয়েশন করতে যায়। তারা জমির মূল্য নির্ধারণ করেন ৩ লাখ টাকা। তিন লাখ টাকার সম্পদ ৬৩ লাখ টাকা দেখিয়ে যদি ঋণ নেওয়া যায় তাহলে সেই ঋণ গ্রহীতা ঋণের কিস্তি কেন ফেরত দেবেন? আমি যখন জেনারেল ম্যানেজার পদের জন্য ইন্টারভিউ দেব তার কিছুদিন আগে আমাকে হাতিরঝিল এলাকার একটি মূল্যায়ন করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। ঋণের আবেদনকারী প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ব্যাংকের অন্য একটি পরিদর্শক টিম জমিটি ভ্যালুয়েশন করে ৬০ লাখ টাকা শতাংশ। কিন্তু প্রধান কার্যালয়ের ঋণ আবেদন বাছাই কমিটির সন্দেহ হলে জমিটি পুনঃমূল্যায়নের জন্য আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমি জানতে পারি জমিটি ২ বছর আগে ৩০ লাখ টাকা শতাংশ হিসেবে ক্রয়কৃত। এর মধ্যে আধা শতাংশ জমি রাস্তার নির্মাণ কাজে চলে যায়। আর সেই সময় জমির মূল্য দুই বছরে তেমন একটা বৃদ্ধি পায়নি। আমি প্রতি শতাংশ জমির মূল্য নির্ধারণ করি ৩০ লাখ টাকা। এর মধ্যে রাস্তায় চলে যাওয়া আধা শতাংশের মূল্য বাদ দেই। লোনটি অনুমোদিত হয়নি। এই ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য আমাদের ব্যাংকের একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার পেছন থেকে চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ঋণ প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায় সম্পদের অতি মূল্যায়নের কারণে। ঋণ আবেদনকারী আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিকট অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু কোনোভাবেই ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করাতে পারেননি। কাছাকাছি সময়ে আশুগঞ্জ শাখা থেকে একটি ঋণ প্রস্তাব আঞ্চলিক অফিসে প্রেরণ করা হয়। আমাদের ব্যাংকের সেই সময়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তার স্ত্রীকে নিয়ে ঋণ আবেদনকারীর বাসায় নিমন্ত্রণ খেয়েছেন। নানা ধরনের গিফট গ্রহণ করেছেন। শাখা ম্যানেজার নিশ্চিত ছিলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করবেন। আমি ঋণ প্রস্তাবটি ফেরত পাঠাই কারণ তাতে কিছু কাগজপত্রের কমতি ছিল। কম থাকা কাগজপত্র না পাঠিয়ে ম্যানেজার নোটে মন্তব্য করেন, ঋণ আবেদনকারী অত্যন্ত প্রভাবশালি এবং বিত্তবান একজন ব্যক্তি। এক সময় আশুগঞ্জ থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত তাদের দেওয়ানি ছিল। কাজেই ঋণ অনুমোদন করা যেতে পারে। আমি নোটের উত্তরে লিখি, ‘একজন ঋণ আবেদনকারী কতটা বিত্তবান এবং প্রভাবশালি তা যত না বিবেচ্য বিষয় তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তার বর্তমান আর্থিক অবস্থা। অতীতে কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে থাকলে তার ঋণের কিস্তি পরিশোধের অবস্থা এবং তার সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থা। আমরা অবশ্যই ঋণ দেব। কিন্তু এমন পাত্রে ঋণ দেওয়া উচিত হবে না যাতে খেলাপি ঋণের পাল্লা ভারি হয়।’ এই ঋণ প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। এ জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবশ্য আমার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছিলেন। কিন্তু আমি ব্যাংকের স্বার্থের বিবেচনায় আমার অবস্থান থেকে এক চুলও নড়িনি।

 

একজন কর্মকর্তা যদি সৎভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কাজ করেন তাহলে তার পক্ষে খেলাপি ঋণ প্রবণতা রোধ করা অনেকটাই সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা অর্থের লোভ সম্বরণ(ঠেকাতে) করতে পারেন না। কেউ কেউ আছেন যারা নিজেরা দুর্নীতি করেন না কিন্তু বসের দুর্নীতিতে সহায়তা করেন। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে চার শ্রেণির কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ করা যায়। এদের মধ্যে একটি শ্রেণি আছেন যারা অত্যন্ত ট্যালেন্ট। কিন্তু ঘুষ ছাড়া কিছুই বুঝেন না। তাদের নীতি হচ্ছে, চাকরি করি বেতন পাই, কাজ করি ঘুষ খাই। আর এক শ্রেণির কর্মকর্তা আছেন যারা ঘুষ খান না। আবার কাজও করেন না। তারা মসজিদে ঘুমান। তৃতীয় এক শ্রেণির কর্মকর্তা আছেন যারা নিজেরা ঘুষ খান না কিন্তু অন্যে ঘুষ খেলে তা দেখেও না দেখার ভান করেন অথবা সহায়তা করেন। শেষ শ্রেণির কর্মকর্তারা নিজেরা তো ঘুষ খানই না অন্যকেও খেতে দেন না। এরাই সবচেয়ে বিপদের মধ্যে থাকেন। তাদের সব সময়ই
সরকারবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করে কোণঠাসা করে রাখা হয়।

 

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অফিসে কর্মরত দুর্নীতিবাজদের দাপটে সৎ ও আন্তরিক কর্মকর্তাদের অনেকেই মারাত্মকভাবে কোণঠাসা হয়ে আছেন। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে এক শ্রেণির কর্মকর্তা দলীয় রাজনীতি চর্চায় নিয়োজিত রয়েছেন। এরা এক সময় জিয়া পরিষদের নামে ব্যাংকে ক্রাসের রাজস্ব কায়েম করেছিল। এখন বঙ্গবন্ধু পরিষদের নামে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব দলবাজ কর্মকর্তা কখনোই একটি সরকারের শুভাকাঙ্খী হতে পারেন না। কারণ এরা দল যখন ক্ষমতার বাইরে থাকে তখন ঘাপটি মেরে থাকেন। দল ক্ষমতায় এলেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেন। এরা হলো সুযোগ সন্ধানী। এদের কারণে কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে না। কিন্তু ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক সরকারকে দুর্নামগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে এদের অবদান রয়েছে। যারা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, তারা কোনোভাবেই রাজনীতি চর্চা করতে পারবেন না। এটা তাদের চাকরিবিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
 

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক থেকে কোনো আবেদনকারী ঋণ মঞ্জুরি পেয়েছেন অথচ কোনো পর্যায়েই ঘুষ-দুর্নীতির আশ্রয় নিতে হয়নি এমন নজির নেই বললেই চলে। এক শ্রেণির কর্মকর্তা আছেন যারা অবৈধ অর্থ পেলে রাতকে দিন আর দিনকে রাত করে ফেলতে পারেন। কিন্তু এদের অধিকাংশই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। তাদের কোনো শাস্তি হয় না। কথায় বলে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির সঙ্গে দুর্ভাগ্য যুক্ত না হলে চাকরি যায় না। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে বসে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন আর কাজ করেন পার্টির অনুকূলে। অধুনালুপ্ত শিল্প ব্যাংকের একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক একবার কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনাকালে বলেছিলেন,আমাদের কোনো কোনো কর্মকর্তার নোট পড়লে মনে হয় তারা ব্যাংকের চাকরি করেন না তারা ঋণ গ্রহীতাদের প্রজেক্টে চাকরি করেন।

 

 

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর দুরবস্থার মূলে রয়েছে এক শ্রেণির কর্মকর্তার ব্যাপক দুর্নীতি। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, যদি বন্ধকী সম্পত্তি সঠিকভাবে ভ্যালুয়েশন করা হয় তাহলে খেলাপি ঋণের প্রবণতা অন্তত ৫০ শতাংশ কমে যাবে। আর কর্মকর্তারা বিবেক (বাংলাদেশ ব্যাংক) এর নিকট দায়বদ্ধ থেকে ব্যাংকের স্বার্থে কাজ করতেন তাহলে খেলাপি ঋণ অবশ্যই সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। যতভাবেই চেষ্টা করা হোক না কেন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শায়েস্তা করা না হলে কোনোদিনই ব্যাংকিং খাতে অবস্থা ভালো হবে না।

 

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড ও অর্থনীতি বিষয়ক লেখক

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ