Views Bangladesh Logo

গিলোটিনের গুরুর গর্দান আর কত?

Rahat  Minhaz

রাহাত মিনহাজ

ভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে নানা নৈরাজ্য এখনও দৃশ্যমান। পালাবদলের পটভূমিতে রাষ্ট্রযন্ত্র এখনও অনেকটা নিস্ক্রিয়। যে শূণ্যতায় আংশিক হলেও চলমান উন্মত্ত জনতার শাসন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই অরাজকতা ও উন্মত্ততা কিছুটা থিতু হলেও শিক্ষাক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা এখনও বিদ্যমান। প্রতিদিনই কোনা না কোনো শিক্ষককে নাজেহাল হতে হচ্ছে। অতি উৎসাহী ছাত্ররা নিজ ইচ্ছায় অথবা কারও প্ররোচনায় শিক্ষককে অবরুদ্ধ করছেন, অপমান করছেন, পদত্যাগে বাধ্য করছেন। কোথাও কোথাও শিক্ষককে সরিয়ে শিক্ষার্থী নিজেও শিক্ষককের চেয়ারে বসে পড়ছেন। কী সব বিভৎস কাণ্ডকারখানা, অকল্পনীয় নৈরাজ্য।

২০২৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় অফিস ত্যাগ করেছিলেন প্রধান শিক্ষক কাজী আলমগীর হোসেন। পরে তাঁর চেয়ারে বসে পড়েছেন নবম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী। (আজকের কাগজ, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪)

কী ভয়াবহ পরিস্থিতি! কী অকল্পনীয় ধৃষ্টতা! চিন্তা করা যায়।

আরও কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়। ২৯ সেপ্টেম্বর পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের পরিচালক ডা. এইচ. এম. সাইফুলর ইসলাম। তাঁর পদত্যাগের শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে, কিন্তু ছেঁকে ধরা মেডিকেল শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দেখে মনে হয়েছে তাঁরা পদত্যাগে বাধ্যই করেছেন।

আরেক ঘটনা আমাদের হৃদয় ভেঙ্গে দেয়। বরিশালের বারেকগঞ্জ সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ শুক্লা রাণী হালদার। ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট তাঁকে অবরুদ্ধ করে, নিদারূণ অপমানের পর পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায় ঔই দিন দুপুরে একদল উন্মত্ত শিক্ষার্থী ও বহিরাগত জনতার চাপে কতোটা অসহায় ছিলেন শিক্ষক শুক্লা রাণী হালদার। প্রায় চার ঘন্টা ধরে চারদিক থেকে অমানসিক চাপ প্রয়োগ করে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। এই অপমান সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত শুক্লা রাণী সরকার লিখেছেন, পদত্যাগ করলাম’। (প্রথম আলো, ৩১ আগস্ট ২০২৪)

পালাবদলের পর শত শত শিক্ষককে এভাবে অপমান করে, জোর করে পদচ্যুত করা হয়েছে, হচ্ছে। নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্মম অপমান সহ্য করে মাথা নীচু করে শিক্ষকরা বাসায় ফিরছেন। কেউ আবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে। খুব সবম্ভবত তাঁদের অপরাধ একটাই, তাঁরা শেখ হাসিনা সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া অথবা তাঁরা সরাসরি আন্দোলনে যোগ দেননি। একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন বিপ্লব, বিদ্রোহ বা আন্দোলনে যুক্ত হওয়া একজন ব্যক্তির একান্ত নিজের সিদ্ধান্ত। একজন পেশাজীবী আন্দোলনের কোন পর্যায়ে, কীভাবে অংশ নেবেন অথবা নেবেন না - সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নাগরিক স্বাধীনতা তাঁর রয়েছে। একজন শিক্ষকও সেই অধিকার রাখেন। কোনো শিক্ষক যদি সক্রিয়ভাবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে না থাকেন তাহলে সেটা তাঁর অপরাধ হতে পারে না। তবে হ্যাঁ, কোনো শিক্ষক যদি সরাসরি এই আন্দোলনে বিরোধীতা করে সহিংসতা উস্কে দিয়ে থাকেন অথবা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন সেটা অবশ্যই আমলে নেওয়া যেতে পারে। সেই অপরাধের বিচার হতে পারে। তার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষও রয়েছে। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে নির্মম অপমানের পর পদত্যাগে বাধ্য করানো কোনো অবস্থাতেই কাম্য হতে পারে না।

এখানেই শেষ নয় অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে নতুন দায়িত্ব পাওয়া, এমনকি ২০২৪ অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া শিকক্ষকরাও লাঞ্ছিত হচ্ছেন, চাকিচ্যূত হচ্ছেন। ফ্যাসিস্টের দোসরের সাথে এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে ধর্ম অবমাননার ভয়ঙ্কর অকল্পনীয়সব অভিযোগ।

কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক। ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র আড়াই ঘন্টা পর শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে রাজশাহী কলেজের নতুন অধ্যক্ষও পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।

পদত্যাগ ছাড়াও আরও নানাভাবে শিক্ষকদের চাপে রাখা হচ্ছে বা চাপে ফেলা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের দুই শিক্ষক অধ্যাপক রেবেকা সুলতানা ও সহযোগী অধ্যাপক মন্দিরা চৌধুরিকে শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে কয়েকটি ব্যাচের ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের দুই জন সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক সাদেকা হালিম ও জিনাত হুদার নাম বিভাগের চেয়ারপর্সনের নাম তালিকা বোর্ড থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। অনেকেই তাঁদেরকে বিভিন্ন মাধ্যমে ধর্মবিদ্বেষী বলছেন। তাদের নামে ঘৃণা ছড়াচ্ছেন।

চলমান এই ন্যাক্কারজনক চর্চার শেষ শিকার দুই জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। চলতি মাসের ১৮ জানুয়ারি ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ব্যাসিক সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর এবং একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এ এস এম মহসিনকে বরখাস্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অভিযোগ ধর্ম অবমাননা বা ইসলামবিদ্বেষ। কি ভীতিকর, ভয়ঙ্কর ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গণে।

অভ্যুত্থান পরবর্তী এই ন্যাক্কারজনক চর্চা নিয়ে কখনই শক্ত বা ন্যায্য অবস্থান নেয়নি অন্তবর্তী সরকার। শিক্ষা উপদেষ্টা গত বছরের ২৫ আগস্ট স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন বিভিন্ন পদে দায়িত্বরতদের জোর করে পদত্যাগ করানোর কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু কার কথা কে শোনে। এছাড়া সরকার এ বিষয়ে দাপ্তরিকভাবেও কিছু করেনি। এ বিষয়ে হুশিয়ারি দিয়ে একটি পরিপত্র জারি করা যেতো। স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া দরকার ছিল, জোর করে আদায় করা পদত্যাগপত্র বা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় চাকুরিচ্যূতি গৃহিত হবে না। বরং এ রকম অসামাজিক, অগ্রহণযোগ্য, ঘৃণ্য কাজের সাথে যুক্তদের অপরাধী হিসেবে বিচার করা। তাতে হয়তো কিছুটা হলেও নৈরাজ্য ঠেকানো যেতো।

শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থী, সাবেক শিক্ষার্থী, কিছু ক্ষেত্রে বহিরাগত ও দুষ্কৃতিকারীদের এমন আচরণে মনে নানা দুশ্চিন্তা ভর করছে। ক্রমাগত অপমান ও লাঞ্ছনার মুখে শিক্ষকরা যদি পাঠদানের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন তাহলে কী হবে? সাধারণত শ্রেণীকক্ষের বাইরেও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ, বিপদে-আপদ ও সংকটে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। এসব কাজে শিক্ষকরা বিমুখ হয়ে পড়লে ক্ষতিটা কার হবে?

এই লেখাটি যখন লিখছিলাম তখনই অনলাইনের পোর্টালের খবরে জানতে পারি, নড়াইল নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ আফরোজা খাতুনকে অবরুদ্ধ করে পদত্যাগ পত্রে সই করানো হয়েছে। হ্যাঁ সারাদেশের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকলেও পারে। সেসব অভিযোগের অনেকগুলো সত্যও হতে পারে। কিন্তু সেগুলো প্রতিকার করার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো আছে, প্রক্রিয়া আছে। এ কাজ শিক্ষার্থীদের না। কোন অবস্থাতেই না।

একজন সামান্য শিক্ষক হয়ে শির্ক্ষীদের দ্বারা শিক্ষকদের এমন অপমান দেখতে দেখতে মনটা বিষিয়ে উঠেছে। একদল উন্মত্ত শিক্ষার্থী যখন তাঁদের শিক্ষকের চাকুরিচ্যূতি বা পদত্যাগের দাবিতে মব করেন তখন কেন যেন এক সময় ফ্রান্সে প্রচলিত গিলোটিনে শিরচ্ছেদের কথা মনে হয়। ফ্রান্সে অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই নির্মম, অমানবিক ও অপমানজনক শাস্তি পদ্ধতি চালু হয়েছিল। যে শাস্তি চেয়ে চেয়ে দেখতেন, উপভোগ করতেন একদল মানুষ। তাঁরা অনেক সময় আনন্দ করতো, দণ্ডপ্রাপ্যকে ভৎসনা করতো।

একদল উন্মত্ত শিক্ষার্থী, বহিরাগত বা ষড়যন্ত্রকারীদের হাত থেকে দেশের শিক্ষকরা মুক্তি পান। এক কামনা রইলো। আর শিক্ষার্থীদের প্রতি প্রতি অনুরোধ গুরুকে আর অপমানজনক গিলোটেন চড়াবেন না। এটা এক ধরনের হত্যাকাণ্ড। সম্মান হারালে শিক্ষকের আর কিছু থাকে না।



(লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ