Views Bangladesh Logo

৩ হাজার বছরের প্রাচীন ইরানি স্বর্ণ কানে ঝুলিয়ে বিতর্কে হলিউড তারকা জেনডায়া

হলিউড তারকা জেনডায়া বরাবরই সাহসী ও ব্যতিক্রমী ফ্যাশনের জন্য পরিচিত। তবে এবার তিনি এমন এক অলংকার পরে জনসমক্ষে হাজির হয়েছেন, যা শুধু ফ্যাশনপ্রেমীদের নয়, ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীদের মধ্যেও তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ, তার কানে শোভা পেয়েছে প্রায় তিন হাজার বছর আগের প্রাচীন ইরানি স্বর্ণের পাত দিয়ে তৈরি এক জোড়া কানের দুল।

সম্প্রতি লন্ডনে পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন চলচ্চিত্র ‘দ্য ওডিসি’-এর প্রচারণামূলক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন জেনডায়া। অনুষ্ঠানে তিনি পরেছিলেন জ্যাকমুসের তৈরি কাস্টম সাদা হ্যাল্টার-নেক গাউন, যার সঙ্গে ছিল দীর্ঘ ওড়নার নকশা। পায়ে ছিল ক্রিশ্চিয়ান লুবউটিনের সাদা পাম্প শু। তবে তার পোশাকের চেয়ে বেশি নজর কাড়ে কানে থাকা ঐতিহাসিক কানের দুলটি।

জানা গেছে, লন্ডনের মেফেয়ারভিত্তিক অ্যান্টিক জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান ব্যারন লন্ডন-এর সংগ্রহ থেকে নেওয়া এই অলংকারে ব্যবহার করা হয়েছে ইরানের প্রাচীন জিভিয়া অঞ্চলে পাওয়া খাঁটি স্বর্ণের পাত। ইতিহাসবিদদের মতে, এসব স্বর্ণের পাত খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১০০০ সালের, অর্থাৎ প্রায় তিন হাজার বছর পুরোনো। প্রাচীন প্রত্নবস্তুগুলোকে সংরক্ষণ করে আধুনিকভাবে ব্যবহারের জন্য ১৮ ক্যারেট হলুদ স্বর্ণ ও হীরা দিয়ে নতুন নকশায় কানের দুল তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি স্বর্ণের পাতের ওপর খোদাই করা রয়েছে আলো বিচ্ছুরণকারী সূর্যের প্রতীক, যা প্রাচীন নিয়ার ইস্ট অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে পরিচিত।

ইতিহাসবিদদের মতে, অ্যাসিরীয় সভ্যতায় এই সূর্যচিহ্ন ন্যায়বিচার, ঐশ্বরিক শক্তি ও সুরক্ষার দেবতা শামাশ-এর প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ফলে এটি শুধু অলংকার নয়, বরং প্রাচীন সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক নিদর্শন হিসেবেও বিবেচিত।

এই অলংকারের ইতিহাস নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন নির্মাতা ও সাংবাদিক শবনম নাসিমি। তিনি জানান, ধ্রুপদি গ্রিসের মন্দির নির্মাণেরও বহু আগে প্রাচীন ইরানি মালভূমি ও স্টেপ অঞ্চলের যাযাবর সিথিয়ানদের সংস্কৃতিতে সূর্যের এই প্রতীক স্বর্ণের অলংকারে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। ১৯৪৭ সালে ইরানের কুর্দিস্তান অঞ্চলের সাক্কেজ শহরের কাছে জিভিয়া গ্রামে একটি ব্রোঞ্জের কফিনের ভেতর বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের প্রত্নবস্তু আবিষ্কৃত হয়। কিন্তু সে সময় প্রত্নতাত্ত্বিকরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকায় স্থানীয় লোকজন সেগুলো ভেঙে বিভিন্ন সংগ্রাহকের কাছে বিক্রি করে দেন।

পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক আন্দ্রে গোদার্ড এসব নিদর্শনের একটি অংশ প্যারিসে প্রদর্শন করলে আন্তর্জাতিকভাবে জিভিয়া স্বর্ণের গুরুত্ব আলোচনায় আসে। পরে প্রত্নতাত্ত্বিক রোমান ঘিরশম্যান জিভিয়া থেকে পাওয়া ৬০০টিরও বেশি প্রত্নসম্পদের তালিকা প্রস্তুত করেন। বর্তমানে এই ঐতিহাসিক স্বর্ণের নিদর্শনের বিভিন্ন অংশ বিশ্বের খ্যাতনামা জাদুঘর ও ব্যক্তিগত সংগ্রহে সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম, লুভর, মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট এবং ইরানের জাতীয় জাদুঘর।

তবে জেনডায়ার এই ব্যতিক্রমী ফ্যাশনকে সবাই ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, হাজার বছরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকে ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করা কতটা নৈতিক।

লন্ডনভিত্তিক লেখক ও ইসলামি ইতিহাস ও শিল্পবিশেষজ্ঞ জিরার আলীর মতে, পশ্চিমা তারকাদের একটি অংশ এখনো গ্লোবাল সাউথের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল নন। তার ভাষায়, জাদুঘর বা ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা প্রত্নবস্তু দিয়ে নিজেকে সাজানো অনেকের কাছে নিরীহ মনে হলেও বাস্তবে এটি অন্য সংস্কৃতির ঐতিহ্যের ওপর প্রতীকী মালিকানা ও আধিপত্যের প্রকাশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

অবশ্য জেনডায়া বা তার স্টাইলিং টিম এ বিতর্ক নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেননি। উল্লেখ্য, আগামী ১৭ জুলাই বিশ্বব্যাপী মুক্তি পেতে যাওয়া ক্রিস্টোফার নোলানের বহুল প্রতীক্ষিত চলচ্চিত্র ‘দ্য ওডিসি’-তে দেবী অ্যাথেনার চরিত্রে জেনডায়াকে দেখা যাবে। ছবিটির প্রচারণার মধ্যেই তার এই ব্যতিক্রমী অলংকার নতুন করে ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও ফ্যাশনের সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিস্তর আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

সূত্র: এনডিটিভি

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ