নির্বাচন প্রস্তুতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোটকে সামনে রেখে নির্বাচন প্রস্তুতি ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, নির্বাচনের আর মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি থাকায় বৈঠকে প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা—উভয় বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। নির্বাচনসংক্রান্ত সব প্রস্তুতি পর্যালোচনা করে প্রধান উপদেষ্টা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া তিন বাহিনী প্রধান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), র্যাব, আনসার, কোস্ট গার্ডসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে অংশ নেন।
প্রেস সচিব জানান, নির্বাচন কমিশন সভায় নিশ্চিত করেছে যে দেশের সব ৩০০টি আসনেই একই দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনের সীমানা নির্ধারণ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল, তা নিরসন করা হয়েছে। এই দুই আসনসহ সব আসনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একযোগে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি বলেন, বুধবার প্রতীক বরাদ্দের দিন। মধ্যরাত থেকে পোস্টাল ব্যালট ছাপা শুরু হবে এবং বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তা পূর্ণমাত্রায় চলবে।
নির্বাচন ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে শফিকুল আলম জানান, এবারের নির্বাচনে মোট ৬৯ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় প্রথমবারের মতো আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৬৪ জন জেলা প্রশাসক রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ মোট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সংখ্যা ৫৯৮ জন।
মনোনয়নপত্র সংক্রান্ত তথ্যে তিনি জানান, মোট ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ২ হাজার ৮৭ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ৪৮১ জন। যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ প্রার্থী রয়েছেন ১ হাজার ৮৪২ জন। এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫১টি রাজনৈতিক দল।
আপিলের বিষয়ে তিনি জানান, মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে ৬৪৫টি আপিল করা হয়। এর মধ্যে ৪২৫টি আপিল মঞ্জুর, ২০৬টি নামঞ্জুর এবং ১৪টি আপিল প্রত্যাহার করা হয়েছে।
নির্বাচনী অবকাঠামো সম্পর্কে প্রেস সচিব বলেন, সারা দেশে ৩০০টি নির্বাচনী আসনে মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৪২ হাজার ৭৭৯টি এবং ভোটিং বুথ ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৯৯টি। মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি।
আইনশৃঙ্খলা প্রস্তুতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ৩০০ আসনে ৩০০টি নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভোটের আগে চার দিন, ভোটের দিন এবং ভোটের পর দুই দিনসহ মোট আট দিনের জন্য ৬৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট ও ১ হাজার ৪৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ন্যূনতম ১৫ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। সাধারণ কেন্দ্রে ১৫ থেকে ১৭ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৮ থেকে ১৯ জন সদস্য মোতায়েন থাকতে পারেন। প্রথমবারের মতো ভোটকেন্দ্রের ভেতরে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার নিরাপত্তায় সশস্ত্র আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি পুলিশ, আনসার, ভিডিপি ও গ্রাম পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রেস সচিব আরও জানান, অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে ২৫ হাজার ৫০০টি বডি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। এসব ক্যামেরা ইতোমধ্যে সরবরাহ ও ব্যবহারোপযোগী হয়েছে। বৈঠকে বডি ক্যামেরার লাইভ ট্রায়ালও প্রদর্শন করা হয়, যেখানে একটি ভোটকেন্দ্র সরাসরি মনিটর করা হয়। বডি ক্যামেরার মাধ্যমে প্রয়োজনে লাইভ স্ট্রিমিং ও এসওএস পাঠানো সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে স্থানীয় পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দ্রুত সাড়া দেবে। এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো এক লাখের বেশি সেনাসদস্য, পাঁচ হাজারের বেশি নৌবাহিনী সদস্য এবং তিন হাজার ৭৩০ জনের বেশি বিমানবাহিনী সদস্য মোতায়েন থাকবে। এছাড়া পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র্যাব, ফায়ার সার্ভিসসহ বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
নতুন উদ্যোগ হিসেবে প্রায় ৫০০ ড্রোন ও ৫০টি ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ড্রোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়ের জন্য একটি কমিটি গঠনের কথাও জানানো হয়। পাশাপাশি ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ্লিকেশন’ ব্যবহার করা হবে, যা কেন্দ্রভিত্তিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নজরদারিতে সহায়তা করবে।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে প্রেস সচিব বলেন, প্রধান উপদেষ্টা জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন—এই নির্বাচন যেন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও নিখুঁতভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং দেশ গর্ব করে বলতে পারে, এটি একটি ভালো ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও তিনি জানান।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে