শেখ হাসিনার শাসনামল ছিল দস্যুদের পরিবার: গার্ডিয়ানকে ড. ইউনূস
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, শেখ হাসিনার শাসনামল ছিল না, বরং এটি ছিল ‘দস্যুদের পরিবার’।
সোমবার (১০ মার্চ) প্রকাশিত ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের সাথে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘হাসিনার শাসনামল ছিল না, এটি ছিল দস্যুদের পরিবার। সরকারপ্রধানের যে কোনো আদেশই তখন সম্পন্ন করা হতো। বিষয়টা এরকম যে, কেউ সমস্যা তৈরি করছে? আমরা তাদের উধাও করে দেব। নির্বাচন করতে চান? আমরা নিশ্চিত করব, আপনি সব আসনে জয়ী হন। আপনি টাকা চান? এখানে ব্যাংক থেকে এক মিলিয়ন ডলার ঋণ যা আপনাকে কখনও ফেরত দিতে হবে না’
গত বছরের আগস্টে ফিরে আসার পর বাংলাদেশের অবস্থা বর্ণনা করে ইউনূস আরও বলেন, ‘তিনি (হাসিনা) যে ক্ষতি করেছেন, তা ছিল বিশাল। এটি সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত একটি দেশ ছিল, যেমন আরেকটি গাজা। তবে এটি ছিল ভবন ধ্বংস না করে বরং পুরো প্রতিষ্ঠান, নীতি, মানুষ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক’।
ইউনূস বলেন, ‘সরকারের সক্রিয় অংশগ্রহণে ব্যাংকগুলোকে জনগণের অর্থলুটের পূর্ণ লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। তারা তাদের কর্মকর্তাদের বন্দুক দিয়ে পাঠিয়ে সবকিছু স্বাক্ষর করাতেন’।
গত বছরের ৮ আগস্ট গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার তিনদিন পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হন ড. ইউনূস।
প্রধান উপদেষ্টা দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘ভারত হাসিনাকে আতিথ্য দিলে তা সহ্য করা হবে। কিন্তু দেশকে আগের অবস্থায় নিতে প্রচার চালাতে ভারতকে প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি দেয়া বিপজ্জনক। এটি দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে’।
গার্ডিয়ান বলছে, বাংলাদেশে হাসিনার শাসনামল ছিল স্বৈরাচার, সহিংসতা এবং দুর্নীতির অভিযোগে ভরপুর। জুলাই ও আগস্ট মাসে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এর সমাপ্তি ঘটে। জাতিসংঘের মতে, ওই সময় বাংলাদেশে সরকারবিরোধী আন্দোলনে এক হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়, যা ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
এমন পরামর্শ দেয়া হয়েছে যে, শেখ হাসিনার শাসনামলের তুলনায় রাস্তাঘাট এখন কম নিরাপদ। কিন্তু ড. ইউনূস এই দাবি অস্বীকার করেছেন। তবে, অন্যরা সতর্ক করেছেন, দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
গত সপ্তাহে এক কঠোর ভাষায় ভাষণে, বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজজামান বলেছিলেন, দেশটি ‘অরাজকতার’ মধ্যে রয়েছে এবং যদি অস্থিরতা বাড়ানো বিভাজন অব্যাহত থাকে, তাহলে ‘এই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ঝুঁকির মুখে পড়বে’।
ইউনূস বলেছিলেন, সেনাবাহিনীর সাথে তার ‘খুব ভালো সম্পর্ক’ রয়েছে এবং সেনাপ্রধানের পক্ষ থেকে ‘কোনো চাপ’ ছিল না। তবে, কেউ কেউ জেনারেলের কথাকে ইউনূসের নেতৃত্বের তীব্র তিরস্কার এবং এমনকি সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার সতর্কতা হিসেবেও নিয়েছিলেন।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসিনার শাসনের পরিণতি হিসেবে দেশের দুর্দশাগুলোকে উপস্থাপন করতে ইউনূস বদ্ধপরিকর। শেখ হাসিনা ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকাকালে এখন প্রতিবেশী দেশটিতে আছেন।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ইউনূসের দায়িত্বে থাকাকালে ভারত তাদের মেরামতে খুব কম আগ্রহ দেখিয়েছে। দিল্লি সম্প্রতি ঢাকাকে ‘সন্ত্রাসবাদকে স্বাভাবিক করার’ অভিযোগ তুলেছে।
যদিও শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে বিচারের মুখোমুখি করতে ডিসেম্বরে ভারতকে ফেরত পাঠাতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের অনুরোধ করা হয়েছিল। ইউনূস দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ভারত সরকারের কাছ থেকে ‘কোনো সাড়া’ পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে এখন ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে হবে, এমনকি অনুপস্থিতিতেও।
ভারতের সরকারই ইউনূসের একমাত্র সমস্যা নয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয়বারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হওয়াও বাংলাদেশের জন্য খারাপ খবর।
গার্ডিয়ান বলেছে, বাইডেন প্রশাসন ড. ইউনূসের রাজনৈতিক ও আর্থিক উভয় দিক থেকেই সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ট্রাম্পের জন্য অগ্রাধিকার পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএইড) এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরও ট্রাম্পের অভিযোগ এবং তা বন্ধ করায় বাংলাদেশ একটি ধাক্কা খেয়েছে।
এক ভাষণে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে শক্তিশালী করতে বরাদ্দকৃত লাখ লাখ ডলার কোনো প্রমাণ ছাড়াই একজন ‘উগ্র বাম কমিউনিস্টকে’ নির্বাচিত করতে ব্যবহৃত হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে আনার প্রয়াসে, ইউনূস সম্প্রতি ট্রাম্পের কোটিপতি সমর্থক ইলন মাস্ককে তার স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশে আনতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
ইউনূসের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, এপ্রিলে মাস্কের দেশ সফর প্রত্যাশিত ছিল।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে