Views Bangladesh Logo

হরতাল: উপমহাদেশে গণমানুষের জন্য এক অভিশাপ

Mohshin  Habib

মহসীন হাবিব

ত ২৮ অক্টোবর ঢাকার বাণিজ্যিক এলাকা নয়াপল্টনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং তাদের সমমনা দলগুলো মহাসমাবেশ করে। এদের মধ্যে ছিল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। এতে অংশ নেয়া সব দল তাদের সমর্থকদের এ আয়োজনে যোগদানের তাগাদা দেয়। ঢাকার আশপাশ, গোটা দেশের জেলা শহর এবং গ্রাম থেকে তাদের নিয়ে আসতে পরিবহনের ব্যবস্থা করে। জামায়াতে ইসলামী ছাড়া অন্য সব দল ১ লাখেরও বেশি সংখ্যক মানুষের সমাবেশ ঘটাতে আগেভাগেই পুলিশের অনুমতি পায়। সমাবেশটি সংঘাতমুক্ত এবং শান্তিপূর্ণ হবে বলেই আশা ছিল। অন্যদিকে, মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করতে অনড় ছিল জামায়াত। এখানেই জাতীয় সংসদ বানচালে ২০১৩ সালে জমায়েত হয়েছিল সরকারবিরোধী শক্তি।

যাইহোক, সেখানে বিরোধী দলগুলোর আচরণ দেখে মনে হয়েছিল, তারা কোনো ফলাফল ছাড়া বাড়ি ফিরবে না। তারা স্পষ্টতই জান তো যে, এই শান্তিপূর্ণ সমাবেশ দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারকে টলানো যাবে না। কাজেই, তারা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াল। কিছু ক্ষেত্রে কাছাকাছি স্থানে আয়োজিত পাল্টা সমাবেশে উপস্থিত আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সঙ্গেও সংঘর্ষ বাঁধে।

এসব ঘটনার মাঝে এক পুলিশ কনস্টেবলকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া পুলিশ ও সাংবাদিকসহ শতাধিক মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। প্রধান বিচারপতির বাসভবনেও হামলার ঘটনা ঘটে। এসব নীতিবিবর্জিত ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল না। যেহেতু অবরোধের মাধ্যমে কৌশলে অজুহাত তৈরি করা হয়েছিল। ফলস্বরূপ, বিরোধীরা দেশব্যাপী অবরোধের ডাক দেয়, যা সময়ের সঙ্গে চলমান রয়েছে।

ভারতীয় উপমহাদেশে হরতাল এবং অবরোধ নতুন কোনো ঘটনা নয়। হরতাল প্রতিবাদ বা ধর্মঘটের একটা ভাষা যেখানে রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে একদল মানুষ একত্রিত হয়ে বাণিজ্য, পরিবহন এবং জনসেবা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ব্যাহত করে। এর মাধ্যমে তারা সরকারকে চাপে ফেলে বা মনোযোগ আকর্ষণ করে। ‘হরতাল’ শব্দটির উদ্ভব গুজরাটি ভাষা থেকে। যার আক্ষরিক অর্থ ‘দরজা বন্ধ করা’। উপমহাদেশ ভাগ হওয়ার আগে মহাত্মা গান্ধীর মতো নেতারা ‘বন্ধ’ পালন করতেন, যা ছিল হরতাল বা ধর্মঘটের আরেক রূপ। এটা ছিল প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সংঘাতমুক্ত উপায়। ইতিহাসে মেলে, আধুনিক ভারতে প্রথমবারের মতো বন্ধ হয়েছিল ১৯২০ সালে, যা ছিল পুরোপুরি সংঘাতমুক্ত। ফলস্বরূপ শেষ অবধি ব্রিটিশরা এ অঞ্চল ছেড়ে চলে যায়। উপমহাদেশকে ভাগ করে দিয়ে যায় দুটি অংশে- ভারত ও পাকিস্তান। পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন বোধগম্য হয়। গঠিত হয় দুটো অংশ- পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। স্বাধীনতা লাভের প্রথম বছরের মধ্যেই পশ্চিমের প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের অসন্তুষ্টি দানা বাঁধতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তান সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে এবং পূর্ব বঞ্চিত হতে থাকে। পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের সঙ্গে জোট বেঁধে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ হরতাল ডাকে ইসলামী সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিস। তখন থেকেই যুগে যুগে প্রয়োজন অনুভূত হলেই একে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়েছেন রাজনীতিবিদরা।

অতীতে, হরতাল রাজনৈতিক তৎপরতার নিয়মিত পন্থা ছিল না। যদিও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে বিস্তৃত ক্ষেত্র প্রস্তুতে এটা বেশ কার্যকর বলে প্রতীয়মান হয়। হরতাল সাধারণত তখনই ডাকা হতো যখন রাজনীতিবিদরা জরুরি অবস্থা দেখতেন এবং জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা পর্যবেক্ষণ করতেন। সেই সময় নেতারা শহরের বাইরে থেকে বাস বা ট্রাকে করে মানুষ আনতে পরিবহনের পেছনে অর্থ খরচ করতেন না।

স্বাধীনতার সময় থেকেই হরতালের গতিপ্রকৃতি এবং বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২ মার্চ প্রথম হরতাল ডেকেছিল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। তখন থেকে হরতালে গণমানুষের অংশগ্রহণ লক্ষণীয়ভাবে কমেছে। এটা এখন সংস্কৃতির চর্চা হিসেবে টিকে রয়েছে। দল কত টাকা ঢালতে পারছে তার ওপর ভিত্তি করে বিপুল সংখ্যক লোকসমাগম ঘটানো হয়। এ প্রক্রিয়াটি বেশ মজার। যতটা সম্ভব লোক জড়ো করতে জেলা পর্যায়ের নেতাদের নির্দেশনা দেন দলের নেতৃত্বস্থানীয়রা। যারা যত বেশি মানুষ জোগাড় করতে পারেন, তাদের তত বেশি টাকা বা গুরুত্ব প্রদানের মাধ্যমে পুরস্কৃত করা হয়। বিশেষ করে যখন তারা প্রতিনিধি হতে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করেন, তখন তা বেশ কাজে দেয়।

কিন্তু বাংলাদেশে গত দুই-তিন দশকে হরতাল কী বয়ে এনেছে? দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে ক্ষেত্রে নজরকাড়া কোনো অর্জন নেই। উল্টো এই ঘন ঘন ধর্মঘট দেশের ঊর্ধ্বগতির অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

অতীতে প্রাথমিক বিচারে বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক জাতি ছিল। আর সেই গ্রাম-বাংলার কৃষকদের এই হরতাল বা সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল নগণ্য। হরতালের সমর্থকরাও খাদ্যের বাধাহীন সরবরাহ নিশ্চিত করতেন। কিন্তু সময়ের সাথে অর্থনৈতিক অবস্থার বিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে আমাদের অর্থনীতি শিল্পকারখার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৩ শতাংশ আয় পোশাক শিল্প থেকে আসে। বিগত যুগে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। যা বছরে ৯ শতাংশ হারে বাড়ছে। প্রায় ৪০ লাখ বাংলাদেশি, বিশেষ করে নারীরা এই খাতে নিয়োজিত আছেন।

বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে প্রায় ৪৫০ বিলিয়নে পৌঁছেছে। ফেডারেশন অব বাংলাদেশে চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) হরতালসহ রাজনৈতিক অস্থিরতার বিরূপ প্রভাবের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এ অবস্থা গোটা অর্থনীতির জন্য হুমকি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর বিপরীত প্রভাব ফেলতে পারে।

গার্মেন্ট শিল্পের বিষয়ে বলা যায়, দেশজুড়ে পাট, মৎস্য, চামড়া, কৃষি এবং ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানির শিল্প গড়ে উঠতে দেখছে বাংলাদেশ। অন্যপিঠে, অভ্যন্তরীন চাহিদা এবং শিল্পকারখানার কাঁচামালের প্রয়োজন মেটাতে বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানিও করে বাংলাদেশ। যা কি না হরতাল ও ধর্মঘটের মতো ঘটনায় ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। মূলত হরতাল, অবরোধ এবং ধর্মঘটের সময় এই বিপত্তি চোখে পড়ে। ২০১৩ সালে হরতাল ও অবরোধ খাদ্য নিরাপত্তায় বিশেষ করে অসহায় মানুষের ওপর কতটা মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল তা পরিষ্কারভাবে মনে করতে পারি আমরা। এসব বিষয় দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের ওপর কতটা গভীর প্রভাব ফেলে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বর্তমান সময়ের বাস্তবতাটা আসলে কী? বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদ এবং তাদের সমর্থকরা বিগত ১৫ বছর ধরে রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত বলে মনে করছেন। এইবার তারা ‘কর অথবা মর’ মানসিকতা নিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে মরিয়া। আর একেই তারা বল প্রয়োগে সরকার পতনের হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন। আপাতত তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা হাসিলে মন দিয়েছেন। মানুষের ভালো-মন্দ এবং দেশের অর্থনীতি তাদের বিবেচনার গৌণ অংশে রয়েছে।

এটা বাস্তবতা যে দেশের বেশিরভাগ মানুষ রাজনৈতিক অনুষ্ঠান হিসেবে হরতালকে গ্রহণ করতে অধৈর্য হয়ে পড়েছেন। তারা সব ধরনের বিকল্পই প্রত্যাখান করছেন। শেখ হাসিনার সরকারও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বাইরে একচুলও নড়তে নারাজ।

আমাদের মতে, বিরোধী দলগুলো যদি সত্যিই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চায়, তবে তারা নির্বাচনী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে পর্যাপ্ত সংখ্যক আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের অনুরোধ জানাতে পারে। যদি তারা প্রকৃত অর্থেই বিশ্বাস করে যে, তাদের এই রাজনীতি মানুষের ভালোর জন্য, তবে অবরোধের মতো রাজনৈতিক সূচি অবধারিতভাবেই পরিত্যাগ করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ