মুম্বাইয়ে ফিরে আসুক গায়ানা-ওভালের স্মৃতি
ধর্মশালায় আফগানিস্তানের বিপক্ষে দাপুটে জয়ে বিশ্বকাপ শুরু করা বাংলাদেশের অবস্থা এখন লেজেগোবরে। আফগান ম্যাচের পর আরো তিনটি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ, যার সবকটিতেই হেরেছে শোচনীয়ভাবে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৩৭ রানে, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৮ উইকেটে ও স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে ৭ উইকেটে হেরেছে চন্ডিকা হাথুরুসিংহের শিষ্যরা। এবার বাংলাদেশের সামনে আরেক ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ, দক্ষিণ আফ্রিকা। মুম্বাইয়ের ওয়েংখেড়ে স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার মুখোমুখি হবে এই দুই দল।
এবারের আসরে রীতিমতো উড়ছে দক্ষিণ আফ্রিকা। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে হেরে অঘটনের জন্ম দিলেও পয়েন্ট তালিকার ৩ নম্বরে রয়েছে দলটি। তাদের চেয়ে বেশি পয়েন্ট রয়েছে কেবল ভারত ও নিউজিল্যান্ডের। তবে এই দুই দল প্রোটিয়াদের বেশি খেলেছে এক ম্যাচ। তিন বড় দল - শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। লঙ্কানদের বিপক্ষে ৪২৮, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩১১ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩৯৯ রানের পাহাড় গড়েছে তারা। কুইন্টন ডি কক, অ্যাইডেন মার্করাম, হেনরিক ক্লাসেন, রাসি ভ্যান ডার ডুসেন, মার্কো ইয়ানসেনরা রয়েছে দারুণ ছন্দে। ইংলিশদের বিপক্ষে ম্যাচে ইনজুরির কারণে খেলা হয়নি নিয়মিত অধিনায়ক টেম্বা বাভুমার। তার পরিবর্তে দলে ঢুকে ৮৫ রানের ইনিংস খেলেছেন রিজা হেন্ডরিক্স। তাই বলা যায়, মঙ্গলবার বাংলাদেশের বোলারদের কঠিন পরীক্ষাই নেবে প্রোটিয়া ব্যাটাররা। পিছিয়ে নেই তাদের বোলাররাও। কাগিসো রাবাদা, লুঙ্গি এনগিদি ও মার্কো ইয়ানসেনরা রীতিমতো আগুন ঝরাচ্ছেন। দলটির রয়েছে শক্তিশালী স্পিন আক্রমণও। কেশভ মহারাজ ও তাবরাইজ শামসির স্পিন বিপদে ফেলে দিতে পারে বাংলাদেশের ব্যাটারদের।
এদিকে, বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডারে চলছে নিয়মিত রদবদল। সাকিবের অবর্তমানে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়া নাজমুল হোসেন শান্ত ম্যাচ শেষে বলেছিলেন যে, ক্রিকেটাররা যেকোনো পজিশনে খেলতে প্রস্তুত। তবে বাস্তবতা হলো তারা ভিন্ন পজিশনে সেট হতে পারছে না। বিশ্বকাপের আগে দারুণ ফর্মে থাকা মেহেদী হাসান মিরাজ মাঠে নামার আগেও হয়তো জানেন না, তাকে কোন পজিশনে তাকে খেলতে হবে। চলতি বছর রানের বন্যা বইয়ে দেওয়া শান্তরও হয়েছে একই হাল। তিনিও জানেন না, কোথায় তাকে ভূমিকা রাখতে হবে। এসব কাণ্ড দেখে কদিন আগে ভারতের কিংবদন্তি লেগস্পিনার অনিল কুম্বলে বলেছিলেন, “আপনি যদি বিশ্বকাপে এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন, তবে সেটা বড় মুশকিলের ব্যাপার!”
যাদের দিকে চোখ রাখবেন
কুইন্টন ডি কক
চলতি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন প্রোটিয়া ওপেনার কুইন্টন ডি কক। ৪ ম্যাচে ২ সেঞ্চুরিতে ২৩৩ রান সংগ্রহ করেছেন তিনি। এবারের আসরে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটারদের মধ্যে তার রানই সবচেয়ে বেশি। শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা ডি কককে সামলাতে হিমশিম খেয়েছে। এই বাঁহাতি বাংলাদেশেরও হুমকির কারণ হতে পারে।
অ্যাইডেন মার্করাম
টেম্বা বাভুমার অবর্তমানে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন অ্যাইডেন মার্করাম। ব্যাট হাতেও হয়েছেন সফল। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই গড়েছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড। আয়ারল্যান্ডের হার্ডহিটার ব্যাটার কেভিন ও’ব্রায়ানের রেকর্ড (৫০ বল) ভেঙে মাত্র ৪৯ বলে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন মার্করাম। এবারের ওয়ানডে বিশ্বকাপে তার স্ট্রাইকরেট টি-টোয়েন্টির মতো। ১৪১.৩৮ স্ট্রাইকরেটে তিনি করেছেন ২০৫ রান। বাংলাদেশের বিপক্ষেও জ্বলে উঠতে পারেন এই ডানহাতি।
হেনরিক ক্লাসেন
দক্ষিণ আফ্রিকার আরেক বিধ্বংসী ব্যাটার হলেন হেনরিক ক্লাসেন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২০ বলে ৩২, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২৭ বলে ২৯ ও নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২৮ বলে ২৮ রান করেছেন। তবে তার বিধ্বংসী রূপটা দেখা গেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। মার্ক উড-রিসে টপলি-আদিল রশীদদের বেদম পিটিয়ে মাত্র ৬৭ বলে ১০৯ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলেন ক্লাসেন। স্পিনে দারুণ খেলেন এই ডানহাতি। তাই বাংলাদেশের স্পিনারদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দিতে পারেন তিনি।
সাকিব আল হাসান
ইনজুরির কারণে ভারতের বিপক্ষে খেলতে পারেননি বাংলাদেশ অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দলে ফেরার কথা রয়েছে এই অলরাউন্ডারের। প্রোটিয়াদের বিপক্ষে সাকিবের রেকর্ডও দুর্দান্ত। গত বিশ্বকাপে (২০১৯) দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২১ রানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে ব্যাট হাতে ৭৫ রান করার পর বল হাতেও পেয়েছিলেন এক উইকেট। ম্যাচসেরার পুরস্কারও উঠেছিল তার হাতে। এবারও সাকিবের দিকেই তাকিয়ে থাকবে বাংলাদেশের সমর্থকরা।
মুশফিকুর রহীম
এবারের বিশ্বকাপটা দারুণ কাটছে উইকেটরক্ষক-ব্যাটার মুশফিকুর রহীমের। প্রথম ম্যাচে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ের তেমন সুযোগ পাননি তিনি, ২ রানে অপরাজিত ছিলেন। এরপর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৫১ ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৬৬ রানের ইনিংস খেলেছেন মুশি। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচেও ৩৮ রানের ইনিংস রয়েছে এই অভিজ্ঞ ব্যাটারের। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও হাসতে পারে তার ব্যাট।
তানজিদ হাসান তামিম
বিশ্বকাপের দল ঘোষণার পর তামিম ইকবালের বাদ পড়া নিয়ে জল কম ঘোলা হয়নি। কয়েক মাস আগেই যিনি ছিলেন বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক, তাকে বাদ দিয়েই ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে গেছে বাংলাদেশ। তামিম ইকবালের জায়গাটা দেওয়া হয়েছে আরেক তামিমকে। তবে তানজিদ হাসান তামিম প্রথম ৩ ম্যাচে ব্যর্থ হয়েছেন পুরোপুরি। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১৩ বলে ৫ রানের পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করেছেন ২ বলে মাত্র ১ রান। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে করেন ১৬। তবে ভারতের বিপক্ষে নিজের জাত ছিনিয়েছেন তরুণ এই ব্যাটার। বুমরাহ-সিরাজদের পিটিয়ে ৪৩ বলে ৫১ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। রোহিত শর্মাদের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ের যে ঝলক তানজিদ তামিম দেখিয়েছেন, সেটা দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও অব্যাহত থাকতে পারে।
মার্কো ইয়ানসেন
ব্যাটে-বলে দারুণ ফর্মে রয়েছেন মার্কো ইয়ানসেন। বল হাতে এখন পর্যন্ত ৪ ম্যাচে ৮ উইকেট শিকার করেছেন এই পেসার । ইনিংসের শেষ দিকে ব্যাট হাতেও দক্ষিণ আফ্রিকাকে দারুণ সার্ভিস দিচ্ছেন তিনি। সর্বশেষ ম্যাচেও ৪২ বলে অপরাজিত ৭৫ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেছেন তিনি। তাই তাকে নিয়েও বিশেষ পরিকল্পনা সাজাতে হবে বাংলাদেশের।
পরিসংখ্যান
একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ও দক্ষিণ আফ্রিকা মোট ২৪ বার মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ বারই জিতেছে প্রোটিয়ারা, আর বাংলাদেশ জিতেছে মাত্র ৬ বার। তবে সর্বশেষ ৪ লড়াইয়ে দাপট দেখিয়েছে বাংলাদেশ। দুদলের মধ্যকার সর্বশেষ ৪ লড়াইয়ের ৩টিতেই জিতেছে টাইগাররা। বিশ্বকাপের পরিসংখ্যানে অবশ্য বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা সমানে সমান। ৪ বারের মোকাবেলায় বাংলাদেশ জিতেছে ২ বার, আর দক্ষিণ আফ্রিকা ২ বার। বাংলাদেশ হেরেছে ব্লুমফন্টেইন ও মিরপুরের ম্যাচে, আর জিতেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের গায়ানা ও লন্ডনের কেনিংটন ওভালে।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ
২০০৩ বিশ্বকাপ (ব্লুমফন্টেইন)
বাংলাদেশ ১০৮ (৩৫.১ ওভার)
দক্ষিণ আফ্রিকা ১০৯-০ (১২ ওভার)
ফল: দক্ষিণ আফ্রিকার ১০ উইকেটে জয়ী।
২০০৭ বিশ্বকাপ (গায়ানা)
বাংলাদেশ ২৫১-৮ (৫০ ওভার)
দক্ষিণ আফ্রিকা ১৮৪ (৪৮.৪)
ফল: বাংলাদেশ ৬৭ রানে জয়ী
২০১১ বিশ্বকাপ (মিরপুর, ঢাকা)
দক্ষিণ আফ্রিকা ২৮৪-৮ (৫০ ওভার)
বাংলাদেশ ৭৮ (২৮ ওভার)
ফল: দক্ষিণ আফ্রিকা ২০৬ রানে জয়ী।
বাংলাদেশ ৩৩০-৬ (৫০ ওভার)
দক্ষিণ আফ্রিকা ৩০৯-৮ (৫০ ওভার)
ফল: বাংলাদেশ ২১ রানে জয়ী।
টি-টোয়েন্টির পর ওয়ানডে বিশ্বকাপেও বাংলাদেশ দলের টেকনিক্যাল কনসালট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ভারতের শ্রীধরন শ্রীরাম। তিনি বাংলাদেশের ব্যাটারদেরকে বলেছেন কীভাবে ইনিংস গড়তে হয় সেটা বিরাট কোহলির কাছ থেকে শিখতে। বাংলাদেশের বিপক্ষে সেঞ্চুরি হাঁকানো কোহলি সম্পর্কে শ্রীরাম বলেন, “দারুণ খেলেনি কোহলি? ৭০-৮০ রানে পৌঁছার আগে একটি বলও সে উড়িয়ে মারেনি। তার ইনটেন্ড, রানিং বিটুইন দ্য উইকেট, গ্যাপ বের করা - এই বিষয়গুলো বিরাট কোহলির কাছ থেকে শিখতে পারে আমাদের ছেলেরা।” বাংলাদেশের ব্যাটিং নিয়ে মোটেও সন্তুষ্ট নন শ্রীরাম। তবে তার বিশ্বাস, পরের পাঁচটি ম্যাচে ব্যাটাররা ভালো কিছু করবে। শ্রীরামের মতো বিশ্বাস বাংলাদেশের কোটি কোটি সমর্থকেরও। ২০০৭ বিশ্বকাপে গায়ানার প্রোভিন্স স্টেডিয়াম ও ২০১৯ বিশ্বকাপে লন্ডনের ‘দ্য ওভালে’ বাংলাদেশ যেভাবে ধরাশায়ী করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকাকে, মঙ্গলবার মুম্বাইয়ের ওয়েংখেড়ে স্টেডিয়ামেও সেটার পুনরাবৃত্তি হোক- এমনটাই চাওয়া টাইগার ভক্তদের।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে