এসএসসি-এইচএসসিতে পরীক্ষার বিষয় ও সময়সীমা কমানোর পরিকল্পনা সরকারের
দেশের দুটি প্রধান পাবলিক পরীক্ষা এসএসসি ও এইচএসসির সময়সীমা সংকুচিত করতে এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ লাঘব করতে পরীক্ষা পদ্ধতিতে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে পরীক্ষার বিষয় সংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং পরীক্ষা গ্রহণের কর্মদিবস উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ও ধারণাপত্র প্রস্তুত করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
এনসিটিবির ধারণাপত্র অনুযায়ী, বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কর্মদিবস এবং এইচএসসি পরীক্ষায় ৩০ থেকে ৩৫ কর্মদিবস বা তার বেশি সময় লাগে। এই দীর্ঘ সময় হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় অন্যান্য শ্রেণির স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীদের শিখন ঘণ্টা আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষার কারণে পরীক্ষার্থীদের ওপর অসহনীয় মানসিক চাপ তৈরি হয়, বিপুলসংখ্যক শিক্ষককে পাঠদান থেকে বিরত থাকতে হয় এবং উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফলাফল প্রকাশ ও উচ্চশিক্ষায় ভর্তি প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ায় সেশনজটের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে এনসিটিবি চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা মিললে দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, কারিকুলাম ও মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ, অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কর্মশালার আয়োজন করা হবে। সেখানে আসা মতামতগুলো পর্যালোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, যা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।’
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে দুই দিনব্যাপী একটি বিশেষ কর্মশালা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে এনসিটিবির। কর্মশালার মূল লক্ষ্য হবে এসএসসি ও এইচএসসির বিদ্যমান বিষয় কাঠামো পর্যালোচনা, পরীক্ষার ব্যাপ্তি কমানোর কার্যকর কৌশল নির্ধারণ, প্রতিবছর ডিসেম্বরের মধ্যে এসএসসি পরীক্ষা গ্রহণের সম্ভাব্যতা যাচাই, ধারাবাহিক ও সামষ্টিক মূল্যায়নের অনুপাত নির্ধারণ এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের রোডম্যাপ তৈরি।
ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও তুলনামূলক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ন্যূনতম কতটি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া যৌক্তিক তা নির্ধারণ করা হবে বলেও জানিয়েছে এনসিটিবি। বিদ্যমান বিষয়গুলোর মধ্যে কোনগুলো একীভূত করা যায়, আবশ্যিক ও ঐচ্ছিক বিষয়ের পুনর্বিন্যাস এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়নের নির্ভরযোগ্যতার মতো বিষয়গুলো নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হবে ওই কর্মশালায়।
প্রস্তাবিত কর্মশালায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মাউশি, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর এবং সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা অংশ নেবেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর-এর পরিচালক অধ্যাপক হোসনে আরা বেগমসহ প্রায় ৯০ জন বিশেষজ্ঞ ও অংশীজন সুপারিশমালা প্রণয়নে অংশীদার হবেন। কর্মশালার ৬টি পৃথক দল সাধারণ সিলেবাসের সঙ্গে মাদ্রাসা ও কারিগরি সিলেবাসের সামঞ্জস্য রক্ষা এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন করবে।
এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম মাসুদুল হক বলেন, ‘পরীক্ষার বিষয় সংখ্যা এবং কর্মদিবস কীভাবে কমানো যায়, সে বিষয়ে আমরা মন্ত্রণালয়ে একটি প্রাথমিক ধারণাপত্র দিয়েছি। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত নয়। পরীক্ষা সংক্রান্ত মূল বিষয়গুলো আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারিত হবে।’
এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর জানান, প্রাথমিক রূপরেখা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও এই মুহূর্তে এই বিষয়ে নতুন কোনো কার্যক্রম নেই। কারণ এনসিটিবির পুরো টিম এখন আগামী শিক্ষাবর্ষের বইগুলোর জরুরি পরিমার্জন এবং সেগুলো পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার মতো বিশাল কর্মযজ্ঞ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে।
এই উদ্যোগের সত্যতা নিশ্চিত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, সম্প্রতি একটি সভায় এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে