সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমছে না
কর্মকর্তাদের আপত্তির মুখে সরকারের প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণে কেনা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অর্ধেকে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সরকার। অর্থ বিভাগ বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে এক চিঠিতে জানিয়েছে, গত ৯ জুলাই পাঠানো দুটি পত্রের বিষয়ে কোনো কার্যক্রম গ্রহণ না করার জন্য অনুরোধ করা হলো।
গত ৯ জুলাই অর্থ বিভাগ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে দুটি চিঠি দিয়েছিল। একটি চিঠিতে সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কেনা সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের মাসিক ভাতা ৫০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকায় নামিয়ে আনার বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বলা হয়। অন্য চিঠিতে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রেষণে দেশে-বিদেশে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রির সুযোগ না দিয়ে শিক্ষা ছুটি দেওয়ার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছিল। দুটি বিষয়েই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা থাকার কথা চিঠিতে উল্লেখ ছিল।
সরকারের উপসচিব থেকে শুরু করে ওপরের স্তরের প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা গাড়ি কেনার জন্য একবারে ৩০ লাখ টাকা সুদমুক্ত ঋণ পেয়ে থাকেন। গত ৯ জুলাই অর্থ বিভাগ এই ঋণ সুবিধা আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়ে একটি পরিপত্রও জারি করেছিল।
অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অর্ধেকে নামিয়ে আনার এই উদ্যোগ শুরু হওয়ার পরপরই কর্মকর্তারা আপত্তি তোলেন এবং সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করে নিজেদের অসন্তোষের কথা জানান। বর্তমানে এই সুবিধা শুধু বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারাই পেয়ে থাকেন, অন্য ২৫টি ক্যাডার এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত—এই বৈষম্য নিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের বিরোধও রয়েছে।
২০১১ সাল থেকে যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব, সচিব ও সিনিয়র সচিবদের সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কেনার সুযোগ চালু হয়, তখন রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা ছিল ২৫ হাজার টাকা। পরে ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে সর্বশেষ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়। ২০১৭ সাল থেকে উপসচিবদেরও প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঘোষণা করে একই সুবিধা দেওয়া শুরু হয়। এই সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগও দীর্ঘদিনের—অনেক কর্মকর্তা সুদমুক্ত ঋণে কেনা গাড়ি পরিবারের ব্যবহারের জন্য রেখে অফিসের বা প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করেন, আবার কেউ কেউ এই গাড়ি ভাড়ায় খাটিয়ে বাড়তি আয় করলেও রক্ষণাবেক্ষণ ভাতার পুরো টাকাই তুলে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
খরচ কমানোর এই উদ্যোগকে ইতিবাচক ও সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ মুস্তাফিজুর রহমান, তবে তিনি সতর্ক করেছিলেন যে শুধু এই ভাতা কমানোই ব্যয় সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়, বরং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির দীর্ঘসূত্রতা ও অপচয় বন্ধ করাই মূল চ্যালেঞ্জ। কর্মকর্তাদের আপত্তির মুখে বৃহস্পতিবার এ নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে কর্মকর্তারা যুক্তি দেন যে দীর্ঘদিন একই বেতনকাঠামোয় থাকা অবস্থায় আগে বাড়ানো কোনো আর্থিক সুবিধা পরে কমানোর নজির অতীতে নেই। শেষ পর্যন্ত এসব আপত্তির মুখেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এল সরকার।
মতামত দিন