কটিয়াদীতে ৪৫ দিন ধরে উচ্চচাপের পাইপলাইনে গ্যাস লিক, বন্ধ কিশোরগঞ্জের সরবরাহ
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার আড়িয়াল খাঁ নদের তলদেশে তিতাস গ্যাসের উচ্চচাপের মূল সঞ্চালন পাইপলাইনে প্রায় দেড় মাস ধরে গ্যাস লিকেজ অব্যাহত রয়েছে। এতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গ্যাস অপচয়ের পাশাপাশি নদীপাড়ের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র গ্যাসের গন্ধ। স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো কিশোরগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কটিয়াদী উপজেলার মসুয়া ইউনিয়নের কাজীর চর এলাকায় নদীর তলদেশ দিয়ে যাওয়া সঞ্চালন পাইপলাইনে এ লিকেজের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি ঘটনাস্থলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। প্রতিদিনই কৌতূহলী মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি চুন কারখানায় গ্যাস সরবরাহের উদ্দেশ্যে অবৈধ সংযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে পাইপলাইনে ছিদ্র সৃষ্টি হয়। তবে এ অভিযোগের সত্যতা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি তদন্ত করছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও তিতাস।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, গত জুন মাসের শুরুতে নদীতীরে একটি চুন কারখানা স্থাপন করা হয়। তাদের দাবি, রাতের আঁধারে নদীর নিচে থাকা উচ্চচাপের পাইপলাইনে অবৈধ সংযোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হলে গ্যাস বের হতে শুরু করে। পরে কচুরিপানা দিয়ে স্থানটি আড়াল করার চেষ্টা করা হলেও পানির ওপর গ্যাসের বুদবুদ ও তীব্র গন্ধে বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে। অভিযোগ ওঠার পর কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায় এবং সংশ্লিষ্টরা এলাকা ছেড়ে চলে যান।
তবে স্থানীয় ইউপি সদস্য মিলন মিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ ঘটনায় জড়ানো হচ্ছে। কারখানার জমি বা মালিকানার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বুরুদিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি রিয়াদ মিয়া বলেন, প্রায় ৪৫ দিন ধরে গ্যাস নির্গমন অব্যাহত রয়েছে। তার অভিযোগ, নিম্নমানের মেরামতকাজ ও ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে কাজ দীর্ঘায়িত হয়েছে। পাশাপাশি গ্যাস চুরি ও অবৈধ সংযোগের পেছনে একটি অসাধু চক্র এবং সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগের পর প্রায় এক মাস পরে তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এরপর গত ৯ জুলাই থেকে মেরামতকাজ শুরু হয়। তবে শনিবার (১ আগস্ট) সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর তলদেশ থেকে তখনও গ্যাস বের হচ্ছিল এবং মেরামতকাজ চলছিল।
কিশোরগঞ্জ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির জোনাল বিক্রয় অফিসের ব্যবস্থাপক মো. মোশাররফ হোসেন জানান, লিকেজের কারণে পাইপলাইনের চাপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে কিশোরগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, এই সঞ্চালন লাইন দিয়েই জেলার প্রায় আট থেকে নয় হাজার গ্রাহকের কাছে গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
তিতাস গ্যাসের ভালুকা অপারেশন ডিভিশনের ব্যবস্থাপক মো. শামীম হোসেন বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো লিকেজ বন্ধ করা। বর্ষাকালে নদীর তলদেশে প্রবল স্রোত, পানির চাপ ও মাটি ধসে যাওয়ায় মেরামতকাজ অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে। অবৈধ সংযোগের অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।
কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, প্রশাসন ও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। লিকেজ পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পর তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হবে। অভিযোগের সত্যতা মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, প্রায় দেড় মাস ধরে উচ্চচাপের পাইপলাইন থেকে গ্যাস নির্গমন চললেও এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত বা কোনো মামলা দায়ের না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মতামত দিন