Views Bangladesh Logo

জ্বালানি সংকট: বাস্তবতা নাকি দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা

যুদ্ধ চলছে ইরানে আর তাতে জ্বালানি ফুরিয়ে গেছে বাংলাদেশে। যেন ইরান নয় আমেরিকা হামলা চালিয়েছে বাংলাদেশে। পুরো দেশ জুড়ে জ্বালানী তেল ও এলপিজি নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র হাহাকার। যেন ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার আগে আমরাই বন্ধ করে দিয়েছি। গ্যাস নেই, পেট্রোল নেই একমাত্র ভরসা বিদ্যুৎ কিংবা সৌরশক্তি।

দেশের চলমান পরিস্থিতিতে রাস্তায় বের হলে যে কারও এমনটাই মনে হতে পারে। পেট্রোল পাম্প গুলো জ্বালানি দিচ্ছে না। মোটরসাইকেলে অকটেন ভরতে গিয়ে বাকবিতণ্ডা এমনকি হাতাহাতিতেও জড়িয়ে পড়ছেন চালকরা। সরেজমিনে দেখা গেছে পেট্রোলপাম্প গুলোর সামনে প্রাইভেটকার-মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। এই চাপ সামলাতে নাজেহাল পাম্প কর্মীরা, আবার কেউ কেউ সব বন্ধ করে বসে বসে কান চুলকাচ্ছেন। জ্বালানি না পেয়ে মোটরসাইকেল ঠেলে ঠেলে ফিরে যাচ্ছেন অনেকেই, কেউ বা আবার চেষ্টা করছেন একটু ম্যানেজ করে তেল ভরে নেওয়ার।

পাম্প কর্মীদের জিজ্ঞেস করা হলেই সরাসরি উত্তর একটাই, তেল নাই, গ্যাস নাই। কিন্তু বিষয়টি আসলেই কী জ্বালানি সংকট নাকি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা? ইজরায়েল-ইরান সংকটে সারাবিশ্বেই জ্বালানির মূল্য বেড়েছে কয়েক দফায়। তবে সেটির প্রভাব এখনই বাংলাদেশে পড়ার কথা না। গেল ৩ মার্চ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানিয়েছিলেন, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ১৪ দিনের ডিজেল, ২৮ দিনের অকটেন, ১৫ দিনের পেট্রল, ৯৩ দিনের ফার্নেস ও ৫৫ দিনের জেট ফুয়েল। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে গতকাল পর্যন্ত ৭টি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে। ইতোমধ্যে দুটি জাহাজ চট্টগ্রামে তেল নিয়ে এসেছে, যার একটির খালাস শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দাম বাড়ার শঙ্কা নেই। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি নজরে রেখে তেলের বিকল্প বাজার খোঁজার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

বিপিসি’র মজুতের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে তা শেষ হতে ১৪ থেকে ২১ দিন লাগবে। অর্থাৎ পুরো মার্চ মাস জুড়েই জনগণের নিশ্চিন্ত ও নিরবিচ্ছিন্ন সেবা পাওয়ার কথা। কিন্তু এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত আয় করতে জ্বালানি তেল মজুদ শুরু করেছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও জনগণ। আর তাতেই দেশজুড়ে এমন সংকট দেখা দিয়েছে। যে পাম্পগুলো তেল দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে বাড়তি দাম নেওয়ার কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে এই দাম শিগগিরই বাড়ানো হবে বলে পাম্পগুলো থেকে এখনই গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অফিযোগ করেছেন ক্রেতারা।

গুজব বা আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ না করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে ৭ মার্চ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন আগামী ৯ মার্চ দেশে আরো দুটি জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা নেই। জনভোগান্তি কমাতে আগামীকাল থেকে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার ঘোষণাও দেন তিনি।

এদিকে জ্বালানি তেলের মজুদ পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে সৃষ্টি হওয়া উদ্বেগ এবং অস্বাভাবিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নির্দেশনা জারি করে যানবাহনভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য একটি দৈনিক কোটা নির্ধারণ করেছেছে বিপিসি। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিদিন প্রতিটি মোটরসাইকেল সর্বোচ্চ দুই লিটার, প্রাইভেট কার ১০ লিটার, এসইউভি, জিপ ও মাইক্রোবাস ২৫ লিটার, পিকআপ ভ্যান ও স্থানীয় বাস ৮০ লিটার, দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও কনটেইনারবাহী ট্রাক ২২০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে। ফিলিং স্টেশনগুলোকে জ্বালানি বিক্রির ক্ষেত্রে কঠোরভাবে নিয়ম মেনে চলতে হবে। প্রতিটি বিক্রির সময় গ্রাহককে পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখ করে একটি নগদ স্মারক বা রসিদ দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে একই গ্রাহক পুনরায় জ্বালানি নিতে চাইলে আগের ক্রয়ের বিলের কপি জমা দিতে হবে। এর মাধ্যমে একই ব্যক্তি বা যানবাহনের নামে অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এই কোটা নির্ধারণের মাধ্যমে পরিবহন খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা এবং একই সাথে অতিরিক্ত মজুদ ঠেকানো সম্ভব হবে বলে আশা করছে বিপিসি।

বাজারে চাল নিয়ে চলে চালবাজী আর তেল নিয়ে চলে তেলবাজি। দেশে দ্রব্যমূল্য নিয়ে বরাবরই এমন অস্থিরতা চলতে থাকে। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে জ্বালানী সংকট। অদ্ভুত উটের পিঠে চলা এই দেশের সকলেই যেন অপেক্ষায় থাকে একটু ঝোপ বুঝে কোপ মারার। আর সুযোগ পাওয়া মাত্রই কেউই সেই সুযোগের সদব্যবহার করতে পিছপা হন না। পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তখন আমাদের উপলব্ধি হয় হায় এ আমরা কী করলাম, কিন্তু তখন আমাদের ভুল শোধরানোর জায়গা থাকে না।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ