বাবার চোখে জল, ছেলের কাঁধে দেশ: চরের নুর এখন মন্ত্রিসভায়
আশির দশকে লঞ্চডুবিতে দুই মেয়েকে হারিয়েছিলেন ইদ্রিস হাওলাদার। নব্বইয়ের দশকে স্ত্রীকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন পটুয়াখালীর গলাচিপার এই সাধারণ মানুষটি। জীবনের সবটুকু সম্বল দিয়ে বড় করেছিলেন চতুর্থ সন্তান নুরুল হককে। স্বপ্ন ছিল একটাই—ছেলে চিকিৎসক হবে, সাদা অ্যাপ্রন গায়ে দিয়ে মানুষের সেবা করবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন ডালপালা মেলার আগেই পাল্টে গেল দৃশ্যপট। চরের সেই কিশোর আজ আর চিকিৎসক নন, বরং তিনি গণমানুষের প্রতিনিধি হয়ে বসতে যাচ্ছেন দেশের প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাপূর্ণ আসনে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা–দশমিনা) আসন থেকে বিজয়ী হওয়ার পর নুরুল হক নুরের মন্ত্রিসভায় আসার সংবাদটি এখন দেশের মানুষের আলোচনায়।
চরের কাদা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: রোমাঞ্চকর যাত্রা
চরবিশ্বাস ইউনিয়নের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা নুর ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। আড়াই বছর বয়সে মা নিলুফা বেগমকে হারানোর পর থেকেই এক কঠিন লড়াই শুরু হয় তার। চরবিশ্বাস জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে তিনি চলে আসেন গাজীপুরে। সেখান থেকে ২০১০ সালে এসএসসি এবং রাজধানীর উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০১২ সালে এইচএসসি পাস করেন। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর পড়াশোনা করলেও তার গন্তব্য ছিল আরও বড়—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্রলীগের প্রাথমিক রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকলেও, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। 'সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ' ব্যানার থেকে তিনি হয়ে ওঠেন লাখো ছাত্রের কণ্ঠস্বর। ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হওয়া ছিল তার জাতীয় রাজনীতির প্রথম বড় ধাপ।
রক্তঝরা রাজপথ ও অসংখ্য মামলার পাহাড়
নুরুল হকের রাজনৈতিক পথচলা গোলাপ বিছানো ছিল না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গত এক দশকে বাংলাদেশের আর কোনো তরুণ নেতা এত বেশিবার হামলার শিকার হননি।
২০১৯-২০২৪: কোটা আন্দোলন থেকে শুরু করে টিএসসিতে ছাত্র অধিকার পরিষদের সমাবেশ—প্রতিটি মোড়েই তিনি হামলার মুখে পড়েছেন।
২০২৪-এর আন্দোলন: কোটাবিরোধী আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার হয়ে পাঁচ দিনের রিমান্ড ও দীর্ঘ কারাভোগ করেছেন।
গুরুতর আঘাত: ২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে তিনি এতই গুরুতর আহত হন যে, তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশেও যেতে হয়েছিল।
হলফনামা অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে এখনও ১৫টি রাজনৈতিক মামলা চলমান। তবুও পিছু হটেননি এই অপ্রতিরোধ্য তরুণ।
বাবার হাহাকার ও আজকের গর্ব
ছেলের প্রতিমন্ত্রী হওয়ার খবর শুনে বৃদ্ধ পিতা ইদ্রিস হাওলাদার আবেগাপ্লুত। তিনি বলেন, ‘ছেলের গায়ে যখনই আঘাত এসেছে, আমি দূরে বসে ছটফট করেছি। কত রাত যে না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি তার হিসাব নেই। আমার স্বপ্ন ছিল সে ডাক্তার হবে। কিন্তু আজ যখন দেখছি সে দেশের মন্ত্রী হয়ে মানুষের সেবা করার সুযোগ পাচ্ছে, তখন মনে হয় সৃষ্টিকর্তা আমার ছেলের ত্যাগের প্রতিদান দিয়েছেন। আমি চাই সে সততার সাথে দেশের কাজ করুক।’
ব্যক্তিগত জীবন ও নতুন রাজনৈতিক দর্শন
নুরুল হকের স্ত্রী মারিয়া আক্তার একজন স্কুল শিক্ষিকা। দুই মেয়ে ও এক ছেলের বাবা নুর সবসময়ই সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। ২০২১ সালে অর্থনীতিবিদ রেজা কিবরিয়ার সাথে মিলে 'বাংলাদেশ গণ অধিকার পরিষদ' গঠন করেন তিনি এবং ২০২৩ সালে দলের সভাপতি নির্বাচিত হন।
একজন চরের সন্তান থেকে প্রতিমন্ত্রী—এই রূপান্তর কেবল একটি পদপ্রাপ্তি নয়, বরং তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক শক্তির এক নতুন বহিঃপ্রকাশ। ভোটারদের প্রত্যাশা, রাজপথের সেই সাহসী নুর এখন মন্ত্রণালয়ের চেয়ারে বসেও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে সমান সোচ্চার থাকবেন।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে