Views Bangladesh Logo

হাতে কাটা সেমাই থেকে অ্যারাবিয়ান কুনাফা, বাঙালির ঈদ-খাবারের বিবর্তন

ঈদের সকাল মানেই বাতাসে ভেসে আসা মিষ্টি সুবাস। নতুন জামা, আতরের গন্ধ আর পরিবার-পরিজন মিলে একসাথে বসে খাওয়া-দাওয়া, প্রতিবেশী, আত্মীয়ের বাড়ি ঘোরাঘুরিই বাঙালির ঈদ।

বাঙালির উৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভোজনবিলাস, আর সেই ভোজনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ঈদের দিনের বিশেষ আয়োজন। তবে আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা ঈদের টেবিলে যে খাবারগুলো দেখি, তা কিন্তু রাতারাতি এই রূপ পায়নি।

আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, বিশ্বায়নের ছোঁয়া আর মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সাথে সাথে আমাদের ঈদের মেন্যুতেও ঘটেছে ব্যাপক বিবর্তন। একসময়ের উঠোনে বসে হাতে কাটা সেমাইয়ের জায়গা আজ দখল করেছে রেস্টুরেন্ট স্টাইলের খাবার কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কুনাফা। আসুন, দশক ধরে বাঙালির ঈদের খাবারের এই নস্টালজিক ও চমকপ্রদ বিবর্তনের যাত্রায় চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

শেকড়ের ঘ্রাণ ও সরলতা: ১৯৬০-৭০ দশক
ষাট বা সত্তরের দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশের মানুষের জীবন ছিল অনেক বেশি সহজ, অনাড়ম্বর এবং প্রকৃতি-ঘনিষ্ঠ। তখন ঈদের খাবারের মূল আকর্ষণ ছিল নিজস্ব হাতে, পরিবারের সবার সম্মিলিত চেষ্টায় তৈরি করা দেশি খাবার।

হাতে কাটা সেমাইয়ের উৎসব:
তখন ঈদের সকালে হাতে কাটা সেমাইয়ের চল ছিল সবচেয়ে বেশি। বাড়ির নারীরা দলবেঁধে উঠোনে পাটি বিছিয়ে চালের গুঁড়ো দিয়ে সুতোর মতো চিকন সেমাই তৈরি করতেন। রোদে শুকিয়ে সেই সেমাই গরুর খাঁটি দুধ, খেঁজুরের গুড় বা লাল চিনি এবং কোরানো নারকেল দিয়ে মাটির চুলায় রান্না করা হতো। এটি কেবল একটি রান্নার প্রক্রিয়া ছিল না, ছিল এক পারিবারিক ও সামাজিক মিলনমেলা।

পিঠা-পুলির আধিপত্য: সেসময় ঈদ মানেই ছিল পিঠার উৎসব। পাটিসাপটা, চিতই, তেলের পিঠা, পাকন পিঠা বা নারকেলের নাড়ু ছাড়া ঈদের সকাল যেন অসম্পূর্ণ ছিল। বিক্রমপুরের ‘বিবিখানা পিঠা’ বা সিলেটের ‘কড়া ভাজির পিঠা’ (বিরুন পিঠা) ছিল উৎসবের প্রধান আকর্ষণ।

মূল আহার: ঈদের দুপুরে পোলাও খাওয়াটা ছিল বেশ বিলাসী একটি ব্যাপার। সাধারণ পরিবারগুলোতে সাদা ভাত বা লাল চালের ভাতের সাথে দেশি মুরগির ঝোল, গরুর মাংস আর ঘন ডাল রান্না হতো। শিল-পাটায় বাটা টাটকা মসলার সুবাসে ভরে উঠত চারপাশ।

নগরায়ণ ও নতুন স্বাদের আগমন: ১৯৮০-৯০ দশক
আশির দশক থেকে সমাজের চিত্র বদলাতে শুরু করে। নগরায়ণের প্রভাব পড়তে শুরু করে মধ্যবিত্তের রান্নাঘরেও। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার সাথে সাথে বাজারে আসতে শুরু করে নতুন নতুন পণ্য।

প্যাকেটজাত সেমাইয়ের দাপট: এই সময়ে বাজারে ব্যাপকভাবে আসতে শুরু করে প্যাকেটজাত লাচ্ছা ও চিকন সেমাই। হাতে কাটা সেমাইয়ের কষ্টসাধ্য জায়গাটি ধীরে ধীরে দখল করে নেয় কারখানায় তৈরি এই রেডিমেড সেমাইগুলো। ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাইয়ের সাথে কিশমিশ ও কাঠবাদামের ব্যবহার আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।

পোলাও-কোর্মা ও রোস্টের যুগ: সুগন্ধি চালের সাদা পোলাও, মুরগির রোস্ট এবং গরুর মাংসের রেজালা-এই ধারণাটি আশির দশকে এসে মধ্যবিত্ত বাঙালির ঘরে ঘরে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কোরবানির ঈদে কলিজা ভুনা ও বট ভাজা সকালের নাশতার প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়।

ডেজার্ট ও পানীয়: জর্দা এবং ক্যারামেল পুডিং ঈদের স্পেশাল ডেজার্ট হিসেবে জায়গা করে নেয়। সেই সাথে মেহমানদের আপ্যায়নে কাঁচের বোতলের কোকাকোলা বা সেভেন-আপ পরিবেশন করাটা এই দশকে এক ধরণের স্ট্যাটাস সিম্বল হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্বায়ন, টেলিভিশন ও বিরিয়ানির যুগ: ২০০০-২০১০ দশক

নতুন মিলেনিয়ামে পদার্পণের সাথে সাথে ক্যাবল টেলিভিশন এবং স্যাটেলাইট চ্যানেল বাঙালির রান্নাঘরে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসে। মানুষ দেশি খাবারের পাশাপাশি ভিনদেশি খাবারের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।

কাচ্চি বিরিয়ানির রাজত্ব: চিরায়ত পোলাও-রোস্টের জায়গা দখল করতে শুরু করে বিরিয়ানি। কাচ্চি বিরিয়ানি, পুরান ঢাকার তেহারি বা মোরগ পোলাও ঈদের প্রধান ভারী খাবার হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়।

টেলিভিশন রেসিপির প্রভাব
: প্রখ্যাত রন্ধনশিল্পীদের টিভি শো-গুলো গৃহিণীদের নতুন নতুন রেসিপি তৈরিতে উৎসাহিত করে। ফলে ঈদের মেন্যুতে চাইনিজ বা থাই খাবার (যেমন- ফ্রাইড রাইস, থাই স্যুপ, চিকেন ফ্রাই) যুক্ত হতে শুরু করে।

রেডি-মিক্স মসলার ব্যবহার: প্যাকেটজাত রেডি-মিক্স মসলার সহজলভ্যতা রান্নার কষ্ট অনেকটাই কমিয়ে দেয়। দীর্ঘসময় ধরে মসলা বাটার ঝামেলা কমে যাওয়ায় অল্প সময়ে বেশি পদ রান্না করার প্রবণতা বাড়ে।

ফিউশন, নান্দনিকতা ও গ্লোবাল ভিলেজ: বর্তমান সময় (২০২০-২০২৬)

তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ, ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব এবং ব্যস্ত নাগরিক জীবনের ছাপ এখনকার ঈদের খাবারে স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। এখনকার ঈদের টেবিল যেন একটি আস্ত গ্লোবাল ভিলেজ।

মধ্যপ্রাচ্য ও গ্লোবাল ডেজার্ট:
এখনকার ঈদে সেমাইয়ের পাশাপাশি ট্রেন্ডিং ডেজার্ট হিসেবে রাজত্ব করছে অ্যারাবিয়ান বা টার্কিশ মিষ্টি। কুনাফা, বাকলাভা, বাসবুসা কিংবা ইতালিয়ান প্যানাকোটা এখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ইদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইউটিউব দেখে ফিউশন ডেজার্ট তৈরি করা এখন ঘরে ঘরে ট্রেন্ড।

নান্দনিক পরিবেশন ও ইনস্টাগ্রাম কালচার: খাবার শুধু সুস্বাদু হলে চলে না, দেখতেও দৃষ্টিনন্দন হতে হয়। খাবারের ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া বা ফুড প্লেটিং এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হোম ডেলিভারি ও ক্লাউড কিচেন:
ব্যস্ততা এড়াতে অনেকেই এখন ফুডপান্ডা, পাঠাও বা ক্যাটারিং সার্ভিস থেকে ইদের স্পেশাল বিরিয়ানির হাঁড়ি অর্ডার করেন। পাড়ার ‘হোম বেকার’দের কাছ থেকে কাস্টমাইজড ঈদ কেক বা ডেজার্ট বক্স কেনা এখনকার নতুন চল।

স্বাস্থ্যসচেতনতা:
একটি বড় অংশ এখন ডায়েট নিয়ে সচেতন। তাই ইদের মেন্যুতে কিটো ফ্রেন্ডলি খাবার, সুগার-ফ্রি ডেজার্ট, বা এয়ার ফ্রায়ারে ভাজা কম তেলের স্বাস্থ্যকর পদের দেখাও মেলে।

আধুনিকতার ভিড়ে টিকে থাকা আঞ্চলিক ঐতিহ্য
ঈদের খাবারে যতই আধুনিকতা আর বিদেশি সংস্কৃতির ছোঁয়া লাগুক না কেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব কিছু ঐতিহ্যবাহী খাবার আজও সগৌরবে তাদের জায়গা ধরে রেখেছে:

চট্টগ্রামের মেজবানি মাংস ও কালাভুনা: চট্টগ্রামের মানুষের কাছে ঈদ মানেই মেজবানি মাংস আর কালাভুনা। বিশেষ মসলায় কালো রং করে ভুনা করা এই মাংসের স্বাদ অনন্য। সাথে থাকে চট্টগ্রামের জনপ্রিয় খাবার ‘আখনি’।

সিলেটের সাতকড়া ও আখনি: সিলেটে মাংস রান্নার একটি জনপ্রিয় অনুষঙ্গ সাতকড়া। লেবু জাতীয় এই ফলটি দিয়ে গরুর মাংস রান্না ছাড়া সিলেটের ঈদ অসম্পূর্ণ। এছাড়া আখনি পোলাও তাদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

বরিশালের মলিদা ও নারকেল চিংড়ি: বরিশাল অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী পানীয় ‘মলিদা’ (চিড়া, চালের গুঁড়া, নারকেল, আদা ও গুড়ের শরবত) ঈদের এক অবশ্যম্ভাবী অংশ। দুপুরে কলাপাতায় নারকেল দিয়ে চিংড়ি মাছ রান্নাও সেখানে বেশ জনপ্রিয়।

খুলনার চুই ঝাল: মাংসের সাথে চুই ঝাল গাছের ডাল মিশিয়ে রান্না করা খুলনার একটি প্রাচীন ঐতিহ্য, যা ঈদের মেহমানদারিতে আজও রাজত্ব করে।

রাজশাহীর কালাই রুটি ও পুরান ঢাকার বাকরখানি: রাজশাহীতে ঈদের দিন মিষ্টির পাশাপাশি ঝাল আইটেম হিসেবে কালাই রুটি আর ভর্তা পরিবেশন করা হয়। অন্যদিকে পুরান ঢাকায় সুতলি কাবাব, চাপড়ি কাবাব আর ঐতিহ্যবাহী বাকরখানি ছাড়া ঈদের উৎসব ভাবাই যায় না।

মিষ্টির ঐতিহ্য: কুমিল্লার রসমালাই বা ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মণ্ডা আজও ইদের দিন বহু বাঙালির ঘরে অতিথি আপ্যায়নে শীর্ষস্থান দখল করে আছে।

ষাটের দশকের সেই উঠোনে বসে হাতে কাটা সেমাইয়ের সাধারণ আনন্দ থেকে শুরু করে আজকের যুগের কুনাফা আর কাচ্চি বিরিয়ানির জমকালো আয়োজন- বাঙালির ঈদের খাবারের এই বিবর্তন মূলত আমাদের আর্থসামাজিক অগ্রগতি, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এবং রুচির পরিবর্তনেরই একটি চমৎকার প্রতিচ্ছবি। সময়ের সাথে সাথে মেন্যুতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে, দেশি মিষ্টির জায়গা দখল করেছে বিদেশি ডেজার্ট আর প্যাকেটজাত খাবার।

তবে রূপ বদলালেও একটি জায়গায় বাঙালি আজও অপরিবর্তিত। আর সেটি হলো পরিবার, পরিজন ও বন্ধুদের সাথে একসাথে বসে খাবার ভাগাভাগি করে নেওয়ার আনন্দ। ঈদের খাবারের আসল স্বাদ যে ভালোবাসায় আর আতিথেয়তায়, এই শাশ্বত সত্যটি ষাট বছর আগেও যেমন সত্যি ছিল, আজও ঠিক তেমনই আছে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ