Views Bangladesh Logo

অপু থেকে ফেলুদা: বাংলা চলচ্চিত্রের এক চিরস্থায়ী নক্ষত্র

বাংলা চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন আজ। মননশীল ও নান্দনিক অভিনয়ের মাধ্যমে যিনি হয়ে উঠেছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি, তার প্রতিটি চরিত্রই দর্শকদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। ইরানের খ্যাতিমান নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামির বিখ্যাত উক্তি—“With every good film I see, I feel reborn”—সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়জীবনের সঙ্গেই যেন সবচেয়ে বেশি মানানসই।

১৯৩৫ সালের এই দিনে কৃষ্ণনগরে জন্ম নেওয়া সৌমিত্র অভিনয়ে অনুপ্রাণিত হন শিশির কুমার ভাদুরীর নাটক দেখে। কর্মজীবনের শুরু আকাশবাণীর ঘোষক হিসেবে হলেও থিয়েটারের টান তাকে নিয়ে আসে অভিনয়ের জগতে। ১৯৫৯ সালে সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’-এ অপু চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

সত্যজিৎ রায়ের পরিচালিত ৩৪টি ছবির মধ্যে ১৪টিতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন সৌমিত্র। ‘দেবী’, ‘চারুলতা’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘অশনি সংকেত’, ‘হীরক রাজা দেশে়’—প্রতিটি ছবিতেই রেখে যান অভিনয়ের অনন্য ছাপ। বিশেষ করে ফেলুদা সিরিজের ‘সোনার কেল্লা’ ও ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এ তার অভিনয় তাঁকে এনে দেয় সর্বজনীন জনপ্রিয়তা। আজও ফেলুদা মানেই অধিকাংশ দর্শকের কাছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। তপন সিংহ, মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার, ঋতুপর্ণ ঘোষ, অপর্ণা সেন, সৃজিত মুখার্জি—প্রজন্মের পর প্রজন্মের পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করে নিজেকে বারবার নতুনভাবে মেলে ধরেছেন। ‘পরামিতার একদিন’, ‘হেমলক সোসাইটি’, ‘বেলাশুরু’, ‘প্রাক্তন’, ‘সোনার পাহাড়’—শেষ জীবনেও তাঁর অভিনয় ছিল সমান দীপ্তিময়।

শুধু চলচ্চিত্র নয়, মঞ্চনাটক ছিল তার প্রাণের জায়গা। ‘রাজা লিয়ার’, ‘টিকটিকি’, ‘ঘটক বিদায়’-এর মতো নাটকে তার অভিনয় আজও স্মরণীয়। কবিতা আবৃত্তিতেও ছিল তাঁর অনন্য দখল; ‘প্রাক্তন’ ছবিতে আবৃত্ত ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতাটি দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।

অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন অসংখ্য সম্মান—জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, পদ্মভূষণ, দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার। ফ্রান্সের ‘লিজিয়ন অব অনার’ ও ‘অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটারস’ সম্মানে ভূষিত হওয়া প্রথম ভারতীয় অভিনয়শিল্পীও তিনি। মৃত্যুর পর ৯৩তম অস্কার মঞ্চে প্রয়াত শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর নাম উচ্চারিত হয়েছে শ্রদ্ধার সঙ্গে।

বর্ণিল ও কর্মময় জীবনজুড়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় রেখে গেছেন অভিনয়ের এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। জন্মদিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্মরণ করা হয় সেই কিংবদন্তিকে, যিনি বাংলা চলচ্চিত্রকে উপহার দিয়েছেন অপু থেকে ফেলুদা—অসংখ্য অবিস্মরণীয় চরিত্র।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ