বাংলাদেশকে নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনে সহায়তা করতে ফ্রান্স প্রতিশ্রুতিবদ্ধ: রাষ্ট্রদূত
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অংশীদার দেশগুলোকে নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনে সহায়তা করতে ফ্রান্স প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে। এর মাধ্যমে এসব দেশকে যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য হওয়ার পরিস্থিতি এড়াতে সহায়তা করা সম্ভব হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মঙ্গলবার ‘ডিক্যাব টক’-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ভারত মহাসাগরীয় দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান কাজে লাগিয়ে ফ্রান্স একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে।”
রাষ্ট্রদূত বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ফ্রান্সের কূটনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য, বিশেষ করে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে, বহুপাক্ষিক একটি ‘তৃতীয় পথ’ এগিয়ে নেওয়ার ওপর কেন্দ্রীভূত।
ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) জাতীয় প্রেস ক্লাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে ডিক্যাব সভাপতি এ কে এম মঈনউদ্দীন ও সাধারণ সম্পাদক এমরুল কায়েশও বক্তব্য দেন।
‘তৃতীয় পথ’-এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রভাবশালী শক্তিগুলোর বিপরীতে এই ধারণার মধ্যে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও ভারসাম্য প্রসঙ্গে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, এর অন্যতম ভিত্তি হলো অবাধ নৌচলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, উত্তর ভারত মহাসাগর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। তাই এই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন ও বিধিবিধান রক্ষায় ফ্রান্স প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে আঞ্চলিক বিরোধ ও সম্প্রসারণবাদী কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতেও দেশটি কাজ করছে।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, এ প্রচেষ্টার মধ্যে সমুদ্র পর্যবেক্ষণ ও আঞ্চলিক কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টিও রয়েছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বিস্তৃত সামুদ্রিক অধিক্ষেত্র থাকা দেশ হিসেবে ফ্রান্স অবৈধ মাছ ধরা, জলদস্যুতা ও অবৈধ বাণিজ্যের মতো উদীয়মান হুমকি মোকাবিলায় সহযোগিতা আরও জোরদার করছে।
ফ্রান্স ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গে সেরে-শার্লে বলেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বেশ শক্তিশালী হলেও বাণিজ্যের কাঠামো কিছুটা অসম।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দেশের পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৪.৫ বিলিয়ন ইউরোর বেশি, যা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্সের আমদানির পরিমাণ দেশটিতে ফ্রান্সের রপ্তানির তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে ফ্রান্সের কাঠামোগত বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্সের আমদানির প্রায় ৯৫ শতাংশই বস্ত্র খাতের, যার মধ্যে পোশাক ও তৈরি পোশাক রয়েছে।
অবশিষ্ট আমদানির মধ্যে বড় ধরনের বাণিজ্যিক চুক্তির আওতায় আসা পণ্য, উড়োজাহাজ শিল্পের পণ্য, বিভিন্ন সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি রয়েছে।
ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, পরিবহন, জ্বালানি ও টেকসই নগর উন্নয়ন খাতে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উপস্থিতির ওপর ফ্রান্সের বাণিজ্যিক কার্যক্রম অনেকাংশে নির্ভরশীল। তবে ওষুধশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মতো খাতেও নতুন করে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
জলবায়ু কূটনীতি ও সংকট মোকাবিলায় ফ্রান্সের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তির উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকে দেশটি পরিবেশগত সহযোগিতা জোরদারে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাপক ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জলবায়ু অভিযোজন, সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর মতো ক্ষেত্রে শক্তিশালী সহযোগিতা গড়ে তুলতে ফ্রান্স তার পরিবেশবিষয়ক নেতৃত্বকে কাজে লাগাচ্ছে।”
রাষ্ট্রদূত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতি বাংলাদেশের উচ্চ ঝুঁকির কারণে টেকসই অবকাঠামো প্রকল্প এবং সবুজ অভিযোজন কৌশল নিয়ে দুই দেশ তাদের সহযোগিতা আরও জোরদার করছে।
বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংস্কার এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও ফ্রান্স কূটনৈতিকভাবে সহযোগিতা করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
২০১৯ সাল থেকে ফ্রান্স নিজেকে নারীবাদী পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে অন্যতম অগ্রণী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে বলেও জানান রাষ্ট্রদূত। এর আওতায় কূটনৈতিক সম্পর্ক, উন্নয়ন উদ্যোগ ও বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে লিঙ্গসমতা গুরুত্ব পাচ্ছে। ফ্রান্সের ২০২৫-২০৩০ সালের নারীবাদী পররাষ্ট্রনীতির কাঠামোর লক্ষ্য হলো বিশ্বব্যাপী লিঙ্গসমতা ও নারীর অধিকার এগিয়ে নেওয়া।
তিনি বলেন, এই নীতি অন্যান্য দেশের অনুরূপ উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নারী ও মেয়েদের মৌলিক অধিকারের প্রতি ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় কাজ করছে। এর প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বন্ধ করা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, নারীর অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং প্রজননস্বাস্থ্য অধিকার।
রাষ্ট্রদূত বলেন, জলবায়ু মোকাবিলায় নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, ডিজিটাল অধিকার সুরক্ষা এবং সমতা নিশ্চিতকারী অর্থনৈতিক নীতিও ফ্রান্সের নারীবাদী পররাষ্ট্রনীতির নতুন অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। তাঁর মতে, এই নীতি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত বৈষম্য এবং নারীর অধিকারের ওপর ক্রমবর্ধমান হুমকির জবাবে নেওয়া হয়েছে। এতে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা ও দেশের অভ্যন্তরীণ সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, “এসব কারণেই আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অংশীদারত্ব আরও গভীর করতে প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ কখনো কখনো কিছুটা সংরক্ষিত অবস্থান গ্রহণ করে। তবে আমরা মনে করি, শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অভিন্ন মূল্যবোধ ও লক্ষ্য রয়েছে—এমন দেশগুলোর আরও সক্রিয় ও দৃঢ় ভূমিকা নেওয়া, পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই পথের কার্যকারিতা তুলে ধরা উচিত।”
তিনি বলেন, কানাডার সঙ্গে অভূতপূর্ব সহযোগিতা তৈরি হচ্ছে এবং আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গেও অংশীদারত্ব গড়ে উঠছে। “এই সহযোগিতা শুধু ভূরাজনৈতিক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিষয়ও জড়িত। আমি বিশ্বাস করি, ফ্রান্স ও বাংলাদেশের সম্পর্কের আরও বিকাশের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।”
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিশৃঙ্খল, ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত হিসেবে বর্ণনা করেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘাত এখন সম্পর্কের একটি সাধারণ রূপ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে সহযোগিতা থাকলেও তা ক্রমেই কমে আসছে।”
সেরে-শার্লে বলেন, বিশ্ব এখন একটি পরিবর্তনশীল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত বাড়ছে এবং অস্থিতিশীলতার ক্ষেত্রও বিস্তৃত হচ্ছে, যেখানে প্রবেশাধিকার ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে।
“এর পাশাপাশি সামরিক শক্তির ব্যবহার এমন একটি বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা এখন অনেক দেশই বিবেচনা করছে,” বলেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্য প্রসঙ্গে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ঘোষণার মাধ্যমে ফ্রান্স আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার এক বছর পূর্তি আজ।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের সময় সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানবিষয়ক একটি সম্মেলনের পাশাপাশি ফ্রান্স ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়।
একই সময়ে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও বেলজিয়ামসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশও ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেয় বা এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, “এই ঘোষণার মাধ্যমে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর একটি বড় সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়াকে নতুন গতি দেওয়া, ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ আকাঙ্ক্ষাকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি ফ্রান্সের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা।”
তিনি আরও জানান, যুদ্ধবিরতি চুক্তি এবং গাজায় আটক জিম্মিদের মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ফিলিস্তিনে ফরাসি দূতাবাস প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নির্ভরশীল থাকবে।
মতামত দিন