রংপুরে চার খুন: সেই বাড়িতে কী ঘটেছিল
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ১২ বছরের ছেলের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। প্রথমে ঘটনাটিকে ডাকাতির ঘটনা বলে ধারণা করেছিল পুলিশ, আর স্বজনদের পক্ষ থেকে এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করা হচ্ছিল। তবে কয়েক ঘণ্টার তদন্তের পর রোববার দুপুরে রংপুর মহানগর পুলিশ জানায়, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ওই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে বলে তাদের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় ২৩ বছরের মুগ্ধ দাস ও ১৯ বছরের সিদ্ধার্থ দাস নামে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, তারা সম্পর্কে মামাতো ভাই এবং দুজনই মাছুয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা। রোববার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক তদন্তের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
রংপুর নগরীর কামালকাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকায় গণপতি চক্রবর্তীর নিজস্ব বাড়িতে পরিবারটি বসবাস করত। গণপতি চক্রবর্তী (৬৫) রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। গত বছরের ডিসেম্বরে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি শহরে একটি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার চেম্বার পরিচালনা করতেন। তার সঙ্গে বাড়িতে থাকতেন স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী। মেয়ে আগামী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেছিলেন। ১২ বছর বয়সী প্রিয়ম ছিল রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
স্বজনদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। কয়েকবার ফোন করেও কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না এবং বাড়িটিও বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। পরে স্বজনেরা সেখানে গিয়ে জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরের জিনিসপত্র এলোমেলো দেখতে পান এবং পুলিশকে খবর দেন। শনিবার রাত ১১টার দিকে পুলিশ বাড়িতে গিয়ে তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকে এবং একে একে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বাড়ির ভেতর থেকে পচা দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল এবং পুলিশের প্রাথমিক ধারণা ছিল, কয়েক দিন আগেই তাদের হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় বাড়ির ছাদে, স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ পড়ে ছিল ছাদে ওঠার সিঁড়িতে, আর ১২ বছরের ছেলে প্রিয়মের মরদেহ পাওয়া যায় একটি কক্ষের খাটের নিচে।
পুলিশ জানায়, চারজনের গলায় দড়ি বা কাপড় পেঁচানোর আলামত ছিল এবং প্রাথমিকভাবে তাদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, আলমারি ও ড্রয়ার খোলা অবস্থায় পাওয়া যায়—এ কারণে প্রথমদিকে তদন্তকারীদের ধারণা হয়েছিল, এটি ডাকাতির ঘটনা হতে পারে। তবে পরে তদন্তে দেখা যায়, টেলিভিশন, ল্যাপটপ ও মুঠোফোনসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া হয়নি, ফলে ডাকাতির তত্ত্ব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। মরদেহ উদ্ধারের পর রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানিয়েছিলেন, ঘর তছনছ অবস্থায় থাকায় প্রাথমিকভাবে ডাকাতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে নিহতদের স্বজনেরা শুরু থেকেই ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করছিলেন। গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী জানান, বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদা দাবি নিয়ে একটি বিরোধ হয়েছিল এবং তার ধারণা ছিল, ওই বিরোধের জেরেও হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। তবে তদন্তের ওই পর্যায়ে পুলিশ বা স্বজন—কেউই নিশ্চিতভাবে হত্যার কারণ বলতে পারেননি। রোববার সকাল পর্যন্ত প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে ডাকাতি, স্থানীয় যুবকদের সম্পৃক্ততা ও পরিকল্পিত হত্যার মতো একাধিক সম্ভাবনার কথা উঠে আসে।
রোববার দুপুরে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদের সংবাদ সম্মেলনের পর তদন্তের চিত্র বদলে যায়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেছিলেন এবং সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিলেন। রাতে ছাদে শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী সেখানে গেলে পরিচিত ওই দুই তরুণকে ইয়াবা সেবন করতে দেখেন এবং বাধা দেন। পুলিশ বলছে, এরপর প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকেই গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়, পরে একে একে তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকেও হত্যা করা হয়। পুলিশের দাবি, নিজেদের পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই দুই তরুণ পরিবারের সবাইকে হত্যা করে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পরও দুই তরুণ কিছু সময় ওই বাড়ির ভেতরে অবস্থান করে, বাড়ির বাথরুমে গোসল করে এবং পরে খেজুর ও শসা খেয়ে অবশিষ্ট ইয়াবা সেবন করে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এরপর হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে—এ জন্য ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করা হয় এবং আলমারি-ড্রয়ার খোলা হয়। পুলিশ আরও জানিয়েছে, আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে নিহতদের দুটি মুঠোফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল।
হত্যাকাণ্ডের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাছুয়াপাড়া এলাকায় অভিযান শুরু করে এবং রোববার ভোরে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আটক করা হয়। মুগ্ধ দাস শহরের সিটি বাজারে মাছের দোকানে কাজ করেন। সিদ্ধার্থ দাস একটি স্বর্ণের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করেন। দুজন সম্পর্কে মামাতো ভাই।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে হত্যার পর তার স্ত্রী, প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে এবং মাত্র ১২ বছরের ছেলেকেও কেন হত্যা করা হলো। পুলিশের বর্তমান ব্যাখ্যা হলো, নিজেদের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অভিযুক্তরা পরিবারের কাউকেই জীবিত রাখতে চায়নি। অর্থাৎ প্রথম হত্যার পর ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করা বা জানার সম্ভাবনা থাকা পরিবারের অন্য সদস্যদেরও তারা হত্যা করে বলে পুলিশের ধারণা।
মরদেহ উদ্ধারের পর স্বজনদের আহাজারিতে এলাকায় হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গণপতি চক্রবর্তীর স্বজন পূজা চক্রবর্তী প্রশ্ন তোলেন, ‘কে মারল আমার দিদি, দাদা ও আদরের দুই সন্তানকে?’ স্বজনেরা জানান, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শনিবার সন্ধ্যার পর থেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, ফোনে কাউকে না পেয়ে পরে তারা বাড়িতে গিয়ে ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পান।
ঘটনার পর রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে স্কুলের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন তারা, গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের দাবি তোলেন। শিক্ষার্থীরা বলেন, গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন তাদের বিদ্যালয়ের সাবেক স্বনামধন্য শিক্ষক। তার পরিবারের আরও তিন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় তারা গভীরভাবে মর্মাহত।
ঘটনাটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানের একই সঙ্গে হত্যার ঘটনায় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। আলোচনার একটি বড় অংশ ছিল প্রথমদিকে ডাকাতির সন্দেহ এবং পরে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসায় তদন্তের বিভিন্ন ধাপ নিয়ে মানুষের প্রশ্ন। অনেকে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ এবং হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
লেখক ও উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ রাজু নুরুল লিখেছেন, ‘রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যাকাণ্ডে পুলিশ খুব দ্রুত সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নামের দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা বলছে, এই দুইজন মাদকাসক্ত, ছাদে মাদক সেবন করতে বাধা দেওয়ার কারণে পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে। দ্রুত একশনে যাওয়ার জন্যে পুলিশকে ধন্যবাদ। কিন্তু স্থানীয়রা বলছে ভিন্ন কথা। তারা বলছে, এই দুইজন মাদকাসক্তই নয়। বরং ঘটনার কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। সকাল থেকে ওখানে থাকা কয়েকজন সাংবাদিকের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ ভিন্ন। পুলিশের দাবিকে আমি উড়িয়ে দিচ্ছি না। কিন্তু আপনাদের কাছে অনুরোধ, এরকম ভয়াবহ একটা ঘটনা নিয়ে অন্তত রাজনীতি কইরেন না। একটা ঘটনা চাপা দিতে আরও কিছু মানুষের জীবন বিপন্ন কইরেন না।’
সাংবাদিক রাজীব হাসান লিখেছেন, ‘গণপতি চক্রবর্তী আমার স্কুলের সাবেক শিক্ষক।... স্কুলে স্যারকে যারা পেয়েছেন তাদের কাছে শুনেছি, স্যার নিয়মনীতির ব্যাপারে কড়া ছিলেন। নিজের এক টুকরো জমিতে বাড়ি বানাবেন, ঠিক করেছিলেন। গত দেড় বছর ধরে চাঁদার জন্য তার কাছে চাপ ছিল। কিন্তু গণপতি চক্রবর্তী এই চাঁদাবাজদের হুমকির তোয়াক্কা করেননি। রাগী শিক্ষক, ছাত্রদের নীতির কথা শিখিয়ে নিজেই নতজানু হলে চলবে কী করে? জানি না, চাঁদার মূল্য চারটি প্রাণ দিয়ে শোধ করতে হলো কি না।’
মতামত দিন