Views Bangladesh Logo

তুরাগ নদে ৪ মরদেহ উদ্ধার, যা জানা গেল

ঢাকার আশুলিয়ার তুরাগ নদের ট্রলার ঘাটে গত ২২ জুন বিকেলে একটি ট্রলারে করে আসা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশ অভিযান চালায়। সেই অভিযানের সময় পুলিশি ধাওয়ার মুখে ট্রলার থেকে কয়েকজন তুরাগ নদে ঝাঁপ দিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন নিহতদের স্বজন ও ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী। সেই ঘটনার পর থেকে পরবর্তী কয়েক দিনে তুরাগ নদের বিভিন্ন স্থান থেকে মোট চারটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার বর্ণনা নিয়ে পুলিশের ভাষ্য ও স্বজন-প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের বৈপরীত্য, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক।

যেভাবে শুরু হয়েছিল সেদিনের ঘটনা
২২ জুন সকাল থেকেই তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা মো. সুমন (১৭) এবং আরিফ হাসান রাকিব (২০)-সহ বেশ কিছু তরুণ বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েন। সুমনের খালু মো. জুয়েল বাবু জানান, সকাল ১১টার দিকে সুমন বাসা থেকে বের হয়। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই দিন সুমন নৌকা নিয়ে আশুলিয়ার রুস্তমপুর এলাকায় আওয়ামী লীগের একটি মিছিলে অংশ নেন। মিছিল শেষে একই ট্রলারে করে তারা আশুলিয়া গরুর হাট-সংলগ্ন নৌকা ঘাটের দিকে যাত্রা করেন। উল্লেখ্য, ২১ জুন সুমন তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আওয়ামী লীগের মিছিলের একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন, যা থেকে তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সুমনের পরিবার জানায়, সে কাঁচামালের আড়তে কাজ করত এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি তারা আগে জানতেন না।

ট্রলার ঘাটে কী ঘটেছিল
স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ৩০ থেকে ৩৫ জন যাত্রী বহনকারী ট্রলারটি আশুলিয়া গরুর হাটের পাশের ঘাটে ভিড়লে সেখানে পুলিশের পোশাক পরা ৮ থেকে ৯ জন এবং সাদা পোশাকের আরও ৮ থেকে ৯ জন তাদের ধাওয়া করেন। পুলিশকে দেখে ট্রলারে থাকা যাত্রীরা যে যেভাবে পারেন পালানোর চেষ্টা করেন— কেউ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে, কেউ ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যান। পুলিশ ট্রলারে উঠে চারজনকে আটক করে এবং পরে ঝোপঝাড়ে ধাওয়া করে আরও তিনজনকে আটক করে। এই সাতজনকে পরে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। আটকের পর পুলিশ একই ট্রলার ব্যবহার করে নদীতে লাফ দেওয়া ব্যক্তিদের খুঁজতে যায়, কিন্তু কাউকে না পেয়ে ফিরে আসে।

আশুলিয়া বাজারের কাছে বসে থাকা একজন প্রত্যক্ষদর্শী (৫০), নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় একটি দৈনিককে বলেন, ‘ওই দিন পুলিশ এই দিক দিয়া গেছে। পুলিশ দেইখা লগে লগে ফাল মারছে। ৫-৭ জন দৌড় মারছে দেখছি।’ তিনি জানান, ঘটনার সময় তিনি পাশের দোকানে চা খাচ্ছিলেন। কৌতূহলবশত কাছের এক কিশোরকে জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, তারা মিছিলে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে ওই ঘাটে আসার পরপরই পুলিশ তাড়া দিয়েছে।

এই প্রত্যক্ষদর্শী জানান, পুলিশ সাতজনকে ধরে নিয়ে গেছে এবং নৌকায় বলে তার হিসাবে ৩০-৩৫ জন ছিলেন। কেউ ঘাসের মাঠ পেরিয়ে সন্ধ্যার পর ফিরেছেন, কেউ সাঁতরে দূরে গিয়ে উঠেছেন।

অপর এক প্রত্যক্ষদর্শী যোগ করেন, নদীতে যারা লাফ দিয়েছিলেন তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেলও নিক্ষেপ করা হয়েছিল এবং ট্রলারের চালকও পরে পালিয়ে যান।

স্বজনদের উদ্বিগ্ন অনুসন্ধান
সুমনের খালু জুয়েল বাবু জানান, ২২ জুনের পর থেকেই তারা নিখোঁজ সুমনকে খুঁজতে শুরু করেন। তিন দিন ধরে ট্রলার নিয়ে তুরাগের বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চালান পরিবারের সদস্যরা। তুরাগ ও আশুলিয়া থানা-পুলিশের কাছেও যান তারা, কিন্তু পুলিশ ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানায়নি বলে অভিযোগ করেন জুয়েল বাবু। এক পর্যায়ে গুজব রটে যে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, পরে নিশ্চিত হওয়া যায় সে গ্রেপ্তার হয়নি। অবশেষে ২৫ জুন রাত সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ পরিবারকে জানায়, জেলেরা একটি লাশ ভাসতে দেখেছেন। মরদেহ উদ্ধারের পর পকেটে থাকা মানিব্যাগের ডকুমেন্ট ও পাঁচটি মোবাইল ফোন দেখে পরিবার সুমনকে শনাক্ত করেন।

মারা যাওয়া আরিফ হাসান রাকিবের চাচা আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না। সে আওয়ামী লীগের মিছিল করতো শুনেছি। যা ঘটেছে ফেসবুকেই দেখেছেন। আমরা একটু ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি।’

দুই মামলার পরস্পরবিরোধী এজাহার
ঘটনাকে ঘিরে দুটি পৃথক মামলা হয়েছে এবং দুটির বর্ণনায় রয়েছে চোখে পড়ার মতো ফারাক। দুটি মামলাতেই ২২ জুন বিকেলে আশুলিয়া গরুর হাট ট্রলার ঘাটের উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু ঘটনার বিবরণ সম্পূর্ণ আলাদা।

২৩ জুন আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাশেদুল জামান বাদী হয়ে ২১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় ৪৫ জনকে আসামি করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করেন। মামলার অধিকাংশ আসামি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের তুরাগ থানার বিভিন্ন ওয়ার্ডের নেতাকর্মী। এজাহারে বলা হয়, ২২ জুন বেলা ৩টার দিকে ওই ঘাটে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ৬০ থেকে ৬৫ জন নেতাকর্মী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিলেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের প্রতিহত করে এবং ছত্রভঙ্গ হওয়ার সময় সাতজনকে আটক করে। এজাহারে নৌকা বা নদীতে লাফ দেওয়ার কোনো বিষয় উল্লেখ নেই।

অন্যদিকে সুমনের সৎ ভাই মো. সালাউদ্দিন বাদী হয়ে যে অপমৃত্যুর মামলা করেন, তাতে বলা হয়েছে ২২ জুন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সুমন বন্ধুবান্ধবসহ প্রায় ২০ থেকে ২২ জন ধউর ব্রিজ ঘাট থেকে নৌকায় উঠে নৌভ্রমণে বের হন। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে আশুলিয়া গরুর হাট ঘাটে তাড়াহুড়া করে নামতে গিয়ে অসাবধানতাবশত সুমনসহ পাঁচ থেকে ছয়জন নদীতে পড়ে যান এবং সাঁতার না জানায় সুমন ডুবে মারা যান।

তবে মামলার বাদী সালাউদ্দিন জাতীয় একটি ইংরেজি দৈনিককে বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারব না। মামলা করার সময় আমার খালু জুয়েল বাবু সঙ্গে ছিলেন। তিনি বলতে পারবেন।

জুয়েল বাবু নিজেই স্বীকার করেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে ঝামেলায় যেতে চাইনি। তাই পুলিশের কথামতো একটা অপমৃত্যুর মামলা করেছি।’

আসামিপক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য
সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া মামলার আসামিদের আইনজীবী আরিফ সরকার পাভেল জানান, দুটি মামলার ঘটনার স্থান ও সময় প্রায় একই হলেও বর্ণনা সম্পূর্ণ আলাদা। গ্রেপ্তার সাতজনকে ২৩ জুন রিমান্ড আবেদনসহ আদালতে হাজির করা হয়। পরে আদালত রিমান্ড আবেদন নাকচ করে সাতজনকে জেলগেটে একদিন জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন।

আসামিদের সঙ্গে কথা বলে পাভেল জানান, তারা প্রথমে তুরাগ এলাকায় নৌকা নিয়ে একটি মিছিল করেন। মিছিলের সময় তুরাগ থানা-পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা ধাওয়া দিলে তারা ট্রলারে করে আশুলিয়া ট্রলার ঘাটে যান। সেখানে পৌঁছানোর পর পুলিশ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা একযোগে তাদের ওপর হামলা চালায়। প্রাণ বাঁচাতে এবং গ্রেপ্তার এড়াতে অনেকে নদীতে লাফ দেন। নদীতে লাফিয়ে পড়াদের লক্ষ্য করেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয় এবং সেখান থেকে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মরদেহ উদ্ধারের বিস্তারিত
২২ জুনের ঘটনার পর থেকে তুরাগ নদের বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে চারটি মরদেহ পাওয়া যায়।

আশুলিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (পরিদর্শক) মাহবুবুর রহমান জানান, ২৫ জুন দিবাগত রাতে তুরাগ নদের আশুলিয়া গরুর হাট-সংলগ্ন নৌকাঘাট থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভাটিতে ভাসমান অবস্থায় সুমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

আমিনবাজার নৌথানার ওসি মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান জানান, ২৪ জুন সকালে দারুসসালাম থানাধীন তুরাগ নদ থেকে আরিফ হাসান রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যিনি ২২ জুন থেকে নিখোঁজ ছিলেন। এছাড়া একইদিন দিয়াবাড়ি ঘাটে গোসল করতে নেমে ডুবে যান রনি মোল্লা (৩৫); কিছুক্ষণ চেষ্টার পর তাকে মৃত অবস্থায় পাড়ে তোলা হয়। রনির বাবা কফিল উদ্দিন জানান, এটি একটি দুর্ঘটনা। এর বাইরে ১৫ বছর বয়সী মারুফ হাসান নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়ে নিখোঁজ হলে পরে তার মরদেহও উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের অবস্থান
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন রোববার দুপুরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দুটিই দুর্ঘটনাজনিত। তিনি বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঘটনাগুলো ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচার চালাচ্ছে। এসব অপপ্রচারকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

পাশাপাশি এ ধরনের অপপ্রচার সম্পর্কে তথ্য থাকলে ঢাকা জেলা পুলিশকে জানানোর অনুরোধ জানান পুলিশ সুপার। তিনি জানান, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে ঢাকা জেলায় মোট ১৭০টি অপমৃত্যুর মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লাশ উদ্ধারসংক্রান্ত।

মামলার তদন্তকারী এসআই রাশেদুল বলেন, তিনি ২২ জুন ঘটনাস্থলে গিয়ে কাউকে নৌকায় পাননি, সবাইকে ঘাটে আটক অবস্থায় পেয়েছেন। নৌকা থেকে কেউ লাফ দিয়েছেন কিনা, সে বিষয়টি তার জানা নেই বলে দাবি করেন তিনি।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ