বন্যা ও পাহাড়ধসে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাসহ নিহত ৩২, ক্ষতিগ্রস্ত ১৬১৩ বসতবাড়ি
টানা নয় দিনের ভারী বর্ষণের পর কক্সবাজারের প্লাবিত এলাকাগুলোর পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। রোববার (১২ জুলাই) রাত থেকে এবং সোমবার (১৩ জুলাই) সকাল পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি না হওয়ায় বন্যাকবলিত এলাকায় পানি নামতে শুরু করে। এরই মধ্যে জেলা প্রশাসন বন্যায় হওয়া ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক হিসাব প্রকাশ করেছে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, পানি পুরোপুরি নেমে গেলে মাঠপর্যায়ে যাচাই শেষে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও স্পষ্ট হবে।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রাণহানি, বসতবাড়ি, কৃষি, মৎস্য, সড়ক যোগাযোগ এবং বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানান, গত ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত নয় দিনে জেলায় মোট ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ৪ মিলিমিটার।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি এবং পাঁচটি পৌরসভার মধ্যে চারটি প্লাবিত হয়। এতে জেলার প্রায় ৪৯ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায় এবং আড়াই লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পেকুয়া উপজেলা, যেখানে প্রায় ৯৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। এরপর মাতামুহুরী উপজেলার ৮৫ শতাংশ, চকরিয়ার ৮০ শতাংশ, কুতুবদিয়ার ৬৫ শতাংশ এবং মহেশখালীর ৫০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। এছাড়া রামুর ৩৫ শতাংশ, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও টেকনাফের ২৫ শতাংশ করে এবং ঈদগাঁও উপজেলার ৫ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায়।
প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্যে বলা হয়েছে, পাহাড়ধস ও বন্যাজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ১৩ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া একজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে উখিয়া উপজেলায়। সেখানে পাহাড়ধসে ১৩ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ১৪ জন নিহত হন। চকরিয়ায় ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং একজন নিখোঁজ হন। এছাড়া কক্সবাজার সদরে তিনজন, রামুতে তিনজন, পেকুয়ায় দুজন এবং মাতামুহুরী, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় একজন করে প্রাণ হারিয়েছেন।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যায় জেলার এক হাজার ৬১৩টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে পেকুয়ায় সবচেয়ে বেশি ৪৫০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া চকরিয়ায় ৩০০টি, কুতুবদিয়ায় ২৫০টি, মহেশখালীতে ২০০টি, মাতামুহুরীতে ১৯০টি, টেকনাফে ১০০টি, উখিয়ায় ৫০টি, ঈদগাঁওয়ে ৩০টি, রামুতে ২৫টি এবং কক্সবাজার সদরে ১৮টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
জেলা মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যায় মৎস্য খাতে প্রায় ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা সংবাদমাধ্যমকে জানান, অতিবৃষ্টিজনিত বন্যায় জেলার ১০ উপজেলার ৬১টি ইউনিয়নের তিন হাজার ৯১৮টি পুকুর এবং ৪৫৩টি চিংড়িঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জলাশয়ের মোট আয়তন প্রায় দুই হাজার ৪৪০ হেক্টর।
তিনি আরও বলেন, ‘এসব পুকুর ও ঘের থেকে এক হাজার ৯৭ টন মাছ, ৩৮৫ টন চিংড়ি, ৩ কোটি ৫৬ লাখ মাছের পোনা এবং ২ কোটি ২১ লাখ চিংড়ির পোনা নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি ৭৬৮টি পুকুর, ঘের ও খামারের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আউশ ধান, আমনের বীজতলা, পানবরজ ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজিসহ মোট চার হাজার ২১১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর মধ্যে চকরিয়ায় এক হাজার ৬৬১ হেক্টর, কুতুবদিয়ায় এক হাজার ১২০ হেক্টর, পেকুয়ায় ৫০০ হেক্টর, রামুতে ৩৪০ হেক্টর, মহেশখালীতে ২৩৭ হেক্টর, টেকনাফে ১৪০ হেক্টর, কক্সবাজার সদরে ৮৮ হেক্টর, ঈদগাঁওয়ে ৭৫ হেক্টর এবং উখিয়ায় ৫০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, জেলার নয় উপজেলায় মোট ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে চকরিয়ায় ১৩ হাজার ৮৫২ জন, পেকুয়ায় ৭ হাজার ২০ জন, কুতুবদিয়ায় ৬ হাজার ৪১৫ জন, রামুতে ৪ হাজার ৮৭৫ জন, মহেশখালীতে ৪ হাজার ৩২০ জন, টেকনাফে ৩ হাজার ১২০ জন, ঈদগাঁওয়ে এক হাজার ৩০৪ জন, কক্সবাজার সদরে এক হাজার ১৬৬ জন এবং উখিয়ায় এক হাজার ১৩৮ জন কৃষক রয়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘এটি প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব। বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে গেলে মাঠপর্যায়ে যাচাই শেষে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।’
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পানি উন্নয়ন বিভাগ-১-এর আওতাধীন ৩৮০ দশমিক ২৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে টানা বৃষ্টিতে বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় ৪৪টি স্থানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পূর্বপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ ও একটি সেতুর অংশ ভেঙে গেছে। বৃষ্টি কমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো দ্রুত মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।’
জেলা প্রশাসনের হিসাবে, বন্যায় জেলার মোট দুই হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, চকরিয়ায় ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু-কালভার্ট, মাতামুহুরীতে ১৯০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু-কালভার্ট এবং পেকুয়ায় ২৩০ কিলোমিটার সড়ক ও দুটি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার সদরে ২০ কিলোমিটার, রামুতে ৫০ কিলোমিটার, কুতুবদিয়ায় ৯ কিলোমিটার, উখিয়ায় ৬ কিলোমিটার, টেকনাফে ৫ কিলোমিটার এবং ঈদগাঁওয়ে ৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সেতু ও কালভার্টের মধ্যে টেকনাফে ১৫টি, উখিয়ায় ১২টি, রামুতে পাঁচটি, কক্সবাজার সদরে চারটি এবং পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় দুটি করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বন্যায় জেলার মোট ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পেকুয়া ও কুতুবদিয়া উপজেলার ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অন্য উপজেলাগুলোর ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতির কোনো তথ্য প্রাথমিক তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে, গত নয় দিনে জেলার ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে এক হাজার ৫৮০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গত মানুষের মধ্যে সাত হাজার ৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ২৯৮ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, অতিরিক্ত ত্রাণের চাহিদা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
মতামত দিন