ফিফা বিশ্বকাপে রেফারি যেন এক ‘চলন্ত ল্যাব’
ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই একজন রেফারি মাঠে নামতেন কেবল একটি বাঁশি, একটি হলুদ কার্ড আর একটি লাল কার্ড পকেটে নিয়ে। কোনো স্ক্রিন বা মনিটর ছিল না, ছিল না কোনো সেন্সর কিংবা কানের কাছে ফিসফিস করে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়ার মতো কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। লাখো দর্শকের সামনে সম্পূর্ণ একা দাঁড়িয়ে স্রেফ নিজের উপস্থিত বুদ্ধি আর চোখের দেখায় মুহূর্তের মধ্যে নিখুঁত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কঠিন দায়িত্ব পালন করতেন একজন মানুষ।
তবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে এসে সেই চিরচেনা দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেছে। মাঠের রেফারিরা এখন আর প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন কেউ নন, বরং প্রযুক্তির চাদরে মোড়া এক একজন সুপার-কানেক্টেড কর্মকর্তা।
চলতি বিশ্বকাপের প্রতিটি রেফারির শরীরে যুক্ত করা হয়েছে তিনটি বিশেষ ডিভাইস—একটি মাইক্রোফোন, একটি ইয়ারপিস (কানের যন্ত্র) এবং অত্যাধুনিক 'রেফ ক্যাম'। মাত্র ১৪ গ্রাম ওজনের এই ক্যামেরাটি ফুটবল সম্প্রচারের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এর মাধ্যমে রেফারি মাঠের কোন দিকে ঠিক কী দেখছেন, তা হুবহু ব্রডকাস্ট কোয়ালিটিতে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন টেলিভিশনের দর্শকরা।
মাঠে কোনো পেনাল্টির সিদ্ধান্ত, ফাউল নিয়ে বিতর্ক কিংবা গোললাইনের সামনে হট্টগোল তৈরি হলে ব্রডকাস্টাররা এখন সরাসরি রেফারির ক্যামেরার ফুটেজে চলে যেতে পারেন। ফলে রেফারি ঠিক ওই মুহূর্তে কী দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা দর্শকরাও পরিষ্কারভাবে দেখতে পান। বিশ্বকাপের ১০৪টি ম্যাচের সবকটিতেই এই ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে, যার ফুটেজ প্রতিটি ম্যাচের রিপ্লে ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে যুক্ত করা হচ্ছে।
তবে এই প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করা মোটেও সহজ ছিল না। রেফারি যখন মাঠে দৌড়ান, তখন মাথার ক্যামেরার ফুটেজ তীব্রভাবে কাঁপতে থাকে, যা খালি চোখে দেখা অসম্ভব। এই সমস্যার সমাধান করেছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান লেনোভো। তারা বিশ্বকাপের জন্য বিশেষভাবে একটি এআই স্ট্যাবিলাইজেশন প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যা রিয়েল-টাইমে কাঁপতে থাকা ফুটেজকে একদম মসৃণ ও দেখার উপযোগী করে তোলে।
এই পথচলা অবশ্য একদিনের নয়। ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে প্রথম রেফারি ক্যামেরার ট্রায়াল দেওয়া হয়েছিল। এরপর ২০২৪ সালে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের একটি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে প্রথমবার কোনো রেফারি এটি পরিধান করেন। ফিফা ২০১৫ সালের ক্লাব বিশ্বকাপে এটি পরীক্ষা করার পর অবশেষে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এটি পুরোপুরি চালু করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
চলতি বিশ্বকাপে সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রযুক্তিটি গ্যালারির কোনো দর্শক চোখেই দেখতে পারবেন না। এটি লুকিয়ে আছে রেফারির কানের ইয়ারপিসের ভেতরে।
ফিফার আপগ্রেড করা 'সেমি-অটোমেটেড অফসাইড টেকনোলজি' এখন আর মাঠের রেফারিদের কাছে সিদ্ধান্ত পাঠানোর আগে ভিএআর রুমের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করে না। কোনো স্পষ্ট অফসাইড শনাক্ত হওয়ার সাথে সাথেই সিস্টেমটি সরাসরি সহকারী রেফারির কানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বলে ওঠে: ‘অফসাইড, অফসাইড, অফসাইড।’ আগের ট্রায়ালগুলোতে যেখানে অফসাইডের নির্ভুলতার সীমা ছিল ৫০ সেন্টিমিটার, এবার তা কমিয়ে মাত্র ১০ সেন্টিমিটারে নামিয়ে আনা হয়েছে।
কাতার ২০২২ বিশ্বকাপের তুলনায় এই পরিবর্তনটি অনেক বড়। আগের নিয়মে এআই অফসাইড চিহ্নিত করার পর তা প্রথমে ভিএআর রুমে পাঠাতো এবং সেখানে থাকা একজন মানুষ রেফারিকে সিদ্ধান্তটি জানাতেন। যোগাযোগের সেই দীর্ঘ চেইনটি এখন পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সিদ্ধান্ত আসছে অনেক দ্রুত, খেলা বন্ধ থাকার সময় কমছে এবং ম্যাচের স্বাভাবিক গতি বজায় থাকছে।
তবে এই এআই (সেমি-অটোমেটেড অফসাইড টেকনোলজি) কেবল পজিশনাল অফসাইড (বল পাস করার মুহূর্তে খেলোয়াড়ের শরীরের অবস্থান) নির্ণয় করতে পারে। কিন্তু অফসাইড পজিশনে থাকা কোনো খেলোয়াড় সত্যিই খেলায় বাধা সৃষ্টি বা প্রভাব ফেলছিলেন কি না—এমন ব্যক্তিনিষ্ঠ বা সাবজেক্টিভ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা এখনো মাঠের রেফারিদের হাতেই রাখা হয়েছে। প্রযুক্তি এখানে কেবল সাহায্যকারী, মানুষের বিকল্প নয়।
রেফারির শরীরে থাকা তিনটি ডিভাইস কিন্তু একা কাজ করে না। এদের পেছনে রয়েছে স্টেডিয়ামজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক বিশাল ট্র্যাকিং নেটওয়ার্ক। মাঠের প্রতিটি খেলোয়াড়ের শরীরের নিখুঁত অবস্থান ট্র্যাক করতে ১২টি ডেডিকেটেড ক্যামেরা প্রতি সেকেন্ডে ৫০টি করে ছবি তুলছে। এর মাধ্যমে খেলোয়াড়দের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি রিয়েল-টাইমে অফিশিয়ালদের কাছে চলে যাচ্ছে।
এর পাশাপাশি ভিএআর বা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির পরিধিও এবার বাড়ানো হয়েছে। ভুলভাবে দেওয়া কর্নার, সেট-পিসের আগে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ের ফাউল এবং দ্বিতীয়বার হলুদ কার্ডের কারণে পাওয়া লাল কার্ডের মতো বিষয়গুলো—যা আগে ভিএআরের আওতার বাইরে ছিল, সেটাও এখন রিভিউ করা যাচ্ছে।
১৬টি স্টেডিয়ামে মোট ১০৪টি ম্যাচের এই টুর্নামেন্টটি ইতিহাসের সবচেয়ে প্রযুক্তি-নির্ভর বিশ্বকাপ। মাঠের খেলা আর রেফারির সিদ্ধান্তের মাঝখানে এখন সেন্সর, ক্যামেরা আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি অদৃশ্য স্তর সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে।
এই সমস্ত প্রযুক্তি ফুটবলকে আরও বেশি ন্যায়সঙ্গত বা ফেয়ার করে তুলছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরও চলবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—২০২৬ সালের বিশ্বকাপে মাঠে নামা রেফারিরাই ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সংযুক্ত, সবচেয়ে বেশি প্রযুক্তি-সহায়তা পাওয়া এবং ইতিহাসের সবচেয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা ম্যাচ অফিশিয়াল।

মতামত দিন