রামুতে হচ্ছে ফিফার ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার
দীর্ঘ জটিলতার পর অবশেষে কক্সবাজারের রামুর রশিদনগরে ফিফার অর্থায়নে বাংলাদেশের ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে। জমি বরাদ্দ ও স্থান নির্বাচন নিয়ে প্রায় চার বছর ধরে চলা প্রক্রিয়া শেষে ১৫ একর ২০ শতক জমির রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) কাছে দলিল হস্তান্তর করেছে জেলা প্রশাসন।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কক্সবাজারের একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাফুফের পক্ষে সভাপতি তাবিথ আওয়াল এবং সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জমি রেজিস্ট্রেশনসংক্রান্ত নথিতে স্বাক্ষর করেন। পরে জেলা প্রশাসক আনুষ্ঠানিকভাবে জমির দলিল বাফুফে সভাপতির হাতে তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান, বাফুফের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
বাফুফে সভাপতি তাবিথ আওয়াল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় রামু উপজেলায় টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের জন্য সাড়ে ১৫ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে জমিটি বাফুফের কাছে হস্তান্তর করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, রামুতে আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হলে দেশের ফুটবলের উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিভাবান ফুটবলাররা এখানে আধুনিক ও পরিকল্পিত প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন।
তাবিথ আওয়াল আরও বলেন, রামুর এই কেন্দ্রকে ঘিরে জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে। দেশের তরুণ ফুটবলার তৈরিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রামুর রশিদনগরের ধলিরছড়া মৌজায় মহাসড়কসংলগ্ন ‘স্বপ্নতরী বিনোদন কেন্দ্র’-এর পাশে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। ফিফার দেওয়া প্রায় ৮৮ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে কেন্দ্রটি নির্মাণ করবে বাফুফে। আগামী মাসেই কেন্দ্রের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু হবে বলে জানান তাবিথ আওয়াল।
প্রকল্পে যা থাকছে
প্রকল্পে আন্তর্জাতিক মানের একাধিক প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম ঘাসের ফুটবল মাঠ, জিমনেসিয়াম, চারতলা আবাসিক ভবন, শ্রেণিকক্ষ, স্পোর্টস সায়েন্স ও মেডিকেল ইউনিট, ইনডোর প্রশিক্ষণ সুবিধা, ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, ভিডিও বিশ্লেষণ ল্যাব এবং কোচিং এডুকেশন সেন্টার থাকবে। পাশাপাশি ডাইনিং, কনফারেন্স ও বয়সভিত্তিক দলের জন্য পৃথক আবাসনের ব্যবস্থাও থাকবে।
বাফুফে কর্মকর্তারা জানান, কেন্দ্রটিতে জাতীয় দল, নারী দল এবং অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-২০ ও অনূর্ধ্ব-২৩সহ বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হবে। কোচ ও ম্যাচ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সারাদেশ থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় বাছাই ও তাদের পরিচর্যার সুযোগও তৈরি হবে।
বাফুফের দাপ্তরিক সূত্র জানায়, ২০২২ সালে বাংলাদেশে টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের জন্য প্রকল্পটি বরাদ্দ দেয় ফিফার নির্বাহী কমিটি। প্রথমে রামুর খুনিয়াপালংয়ে ২০ একর জমি নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সেটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে পড়ায় পরিবেশগত আপত্তির কারণে ওই স্থান বাতিল করা হয়। পরে বিকল্প জমি খুঁজতে শুরু করে বাফুফে।
২০২৫ সালে রামুর রশিদনগরের ধলিরছড়া মৌজায় ১৫ দশমিক ২০ একর খাসজমি চূড়ান্ত করা হয়। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে জমিটি বাফুফের অনুকূলে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়।
বাফুফের প্রকল্প কর্মকর্তা তানভির আহমেদ ছিদ্দিকী বলেন, ভৌগোলিক সুবিধা, প্রশস্ত জায়গা এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা বিবেচনায় রামুর রশিদনগরকে বেছে নেওয়া হয়েছে। মহাসড়কের পাশে হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও সহজ হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) জমির উদ্দীন বলেন, নির্ধারিত জমিটি পাহাড় শ্রেণির নয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে গাছপালা ও পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনাও নেই। সার্বিক সমীক্ষা শেষে ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার স্থাপনে অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, ২০২৫ সালে প্রকল্পটির জমি বরাদ্দের বিষয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর বাফুফের সঙ্গে সমন্বয় করে জমি নির্ধারণ এবং মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা হয়েছে।
বাফুফের টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান কামরুল হাসান হিলটন বলেন, নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ঝুলে ছিল। কয়েক দফা ফিফার কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করতে হয়েছে। একপর্যায়ে প্রকল্পটি বাতিল হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত জমি রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়েছে। এখন দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে।
জমি হস্তান্তরের পর বাফুফে সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন।
মতামত দিন