Views Bangladesh Logo

সিজিএস গোলটেবিলে বক্তারা

‘নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় আর আতঙ্ক কাজ করে’

য় ও আতঙ্কের পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ সম্ভব নয়। আর ভোটাধিকার নিশ্চিত না হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে- এমন মন্তব্য করেছেন সিলেটের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, নাগরিক সমাজ ও পেশাজীবী প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সিলেটে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘প্রতিটি কণ্ঠের মূল্য: সংখ্যালঘু অংশগ্রহণ ও বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা।

নগরীর রামের দিঘিরপাড় এলাকার একটি হোটেলের হলরুমে অনুষ্ঠিত এই গোলটেবিল বৈঠকে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নেতারা অংশ নেন।

আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে আসে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কার্যকর, নিরাপদ ও নির্ভীক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে মূলধারায় আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

গোলটেবিলের শুরুতে সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ যখন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণকে গণতন্ত্রের একটি মূল মানদণ্ড হিসেবে দেখতে হবে। এটি কোনো পার্শ্ব ইস্যু নয়।

তিনি বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ সংখ্যালঘু হলেও রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী অঙ্গীকারে তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব পায় না। নির্বাচনের সময় অনেক দল তাদের ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করলেও নির্বাচন শেষে দৃশ্যমান দায়বদ্ধতা দেখা যায় না।

জিল্লুর রহমান আরও বলেন, একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন মানে শুধু ভোট দেওয়ার সুযোগ নয়, বরং ভয়মুক্ত পরিবেশে কোনো চাপ বা হুমকি ছাড়া রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এটি না হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

তিনি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি, ভূমি-সম্পত্তি সংকট ও ন্যায্য অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবহেলা এখনো কাটেনি। শুধু স্বীকৃতি নয়, বাস্তবায়নই অধিকারকে অর্থবহ করে তোলে।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সিলেটের সভাপতি অ্যাডভোকেট মৃত্যুঞ্জয় ধর বলেন, ২০১৪ সালে আমরা ৮ দফা দাবি উত্থাপন করেছিলাম, কিন্তু আজও তার বাস্তবায়ন হয়নি। নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় আর আতঙ্ক কাজ করে।

তিনি অভিযোগ করেন, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বাড়িঘর পোড়ানো, এমনকি মানুষ পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। মব কখনো বিচার হতে পারে না, কিন্তু এখন মবই বিচার করছে।

সচেতন নাগরিক কমিটি সিলেটের সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দা শিরিন হক বলেন, নারী কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কার্যকর কোনো উপস্থিতি নেই। মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটছে, অথচ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা স্পষ্ট।

তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে নারী ও সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত সীমিত, যা সংবিধান ও গণতন্ত্র—উভয়ের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ইকবাল সিদ্দিকী বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, ২০২৪ সালে আবার পরিবর্তনের আশা দেখেছি। কিন্তু বাস্তবে হতাশাই বেড়েছে।

তিনি গণমাধ্যমের ওপর হামলা, মব সংস্কৃতি ও সমাজের মানসিক অবক্ষয়ের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, আইনশৃঙ্খলা ঠিক না থাকলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সিলেট মহানগরের সভাপতি বিজয় কৃষ্ণ বিশ্বাস প্রশ্ন তুলেন,
‘আমি হিন্দু হওয়ার কারণে কি এই দেশের রাষ্ট্রপতি হতে পারব না? অধিকার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আমরা কেন পিছিয়ে?’

চা শ্রমিক নেতা হরি সবর বলেন, আমরা এখনো ন্যায্য মজুরি, জমি ও শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত।

প্রেসবেট্রিয়ান চার্চ সিলেটের চেয়ারম্যান ডিকন নিঝুম সাংমা বলেন, আমরা কথা বললেই সংকটে পড়ি। নির্বাচনের আগে ও পরে কী হবে—এই ভয়েই আমরা নীরব থাকি।

হিজড়া যুব কল্যাণ সংস্থার প্রতিনিধিরা বলেন, রাজনৈতিক স্বীকৃতি থাকলেও বাস্তব নিরাপত্তা ও সম্মান এখনো অধরা।

এডকোর সিইও লক্ষীকান্ত সিংহ বলেন, বিএনপির ৩১ দফা কিংবা জামায়াতের ইশতেহার—কোথাও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি নেই। তাই অনেকের কাছে নির্বাচন অর্থহীন হয়ে উঠছে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ