শঙ্কা ও উদ্বেগ ভোট প্রদানে সংখ্যালঘুদের নিরুৎসাহিত করতে পারে: হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ
সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ভোট দিয়ে তাদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করতে চাইলেও জীবন, জীবিকা, সম্পদ ও সম্ভ্রম নিয়ে শঙ্কা ও উদ্বেগ কাটছে না। এই শঙ্কা ও উদ্বেগ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ভোট প্রদানে নিরুৎসাহিত করতে পারে বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘চলমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন’ সামনে রেখে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির লিখিত বক্তব্যে এ কথা জানানো হয়। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট দিতে নিরুৎসাহিত হওয়ার দায় সরকার, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে নিতে হবে। এই অনভিপ্রেত পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনে নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের দৃঢ় ও কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করা হয়।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ জানায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ১৪ দিন বাকি থাকলেও গত বছরের মতো চলতি বছরেও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম ২৭ দিনে সারাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৪২টি, যার মধ্যে ১১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা।
সংগঠনটির দাবি, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীরা সারাদেশে প্রতিনিয়ত ভীতি ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সংখ্যালঘু ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবে নিজ নিজ অবস্থানে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছেন না। এই পরিস্থিতিতে অনেক সংখ্যালঘু পরিবার অভ্যন্তরীণভাবে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হচ্ছে।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণভোটের নামে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোট যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ঘোষণা করা হয়েছে। এর পক্ষে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সরাসরি প্রচারকে দুঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক ও পক্ষপাতদুষ্ট বলে মন্তব্য করে ঐক্য পরিষদ।
সংগঠনটি মনে করে, অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের সংবিধান আজ চ্যালেঞ্জের মুখে। এই পরিস্থিতি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সমঅধিকার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমন বাস্তবতায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া এবং নিজ পছন্দ অনুযায়ী ভোট প্রদান একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।
এ অবস্থায় হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সংবাদ সম্মেলন থেকে সাত দফা দাবি জানায়। এগুলো হলো—
প্রথমত, ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে। প্রার্থী হওয়ার কারণে যেন কোনো রকম বাধার সম্মুখীন না হতে হয়। নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণে সমান সুযোগ যেন পায়, তার জন্য নির্বাচন কমিশনকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচনী প্রচারে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হোক। যদি কোনো প্রার্থী বা কোনো দল নির্বাচনে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতাকে ব্যবহার করে তবে তার শাস্তির বিধান রাখতে হবে।
তৃতীয়ত, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘু ও নৃগোষ্ঠীর নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে ভোটদানের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক। প্রয়োজনে সেনাবাহিনী নিয়োগের মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হোক।
চতুর্থত, নির্বাচনের পূর্বাপর সময়কালে ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের তাগিদে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে পুলিশ, আনসার ইত্যাদি মোতায়েনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবির নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা করা হোক। নিয়মিত মনিটরিং করার জন্য একটি ‘মনিটরিং সেল’ গঠন করতে হবে।
পঞ্চমত, নির্বাচন কমিশনের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় গৃহীত যাবতীয় পদক্ষেপের বিষয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, রাজনৈতিক দলসহ সবাইকে সম্যকভাবে অবহিত করতে হবে।
ষষ্ঠত, নির্বাচনী প্রচারকাজে মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা, গির্জাসহ যেকোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে।
সপ্তমত, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, বিবৃতি, গুজব প্রচার বা এ ধরনের যাবতীয় প্রচার বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় অপরাধ গণ্য করতে হবে।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে