ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ক্ষোভে পেঁয়াজ পানিতে ফেলছেন ফরিদপুরের কৃষকরা
ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় উৎপাদিত পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম হতাশায় কৃষকরা পেঁয়াজ খাল, পুকুর ও ডোবার পানিতে ফেলে দিচ্ছেন। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর অনেক কমে যাওয়ায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা।
সম্প্রতি উপজেলার খোয়াড় গ্রামের একটি ডোবার পানিতে কৃষকদের পেঁয়াজ ফেলে দিতে দেখা যায়। এমন দৃশ্য স্থানীয়দের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, বর্তমান বাজারদরে পেঁয়াজ বিক্রি করার চেয়ে পানিতে ফেলে দেওয়া কম কষ্টের।
পেঁয়াজ চাষি দাউদ মাতুব্বর বলেন, বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে সার, বীজ, সেচ, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরিসহ ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা খরচ হয়। সংরক্ষণের সময় ওজনও কমে যায়। ফলে লোকসান ছাড়া আর কিছুই থাকছে না।
একই ধরনের সংকটে রয়েছেন ফরিদপুরের নগরকান্দা, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, সদরপুর ও মধুখালী উপজেলার পেঁয়াজ চাষিরাও। ভালো ফলন হলেও বাজারে দাম কম থাকায় অধিকাংশ কৃষক লোকসানে পড়েছেন। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করায় কিস্তি পরিশোধ করতেও হিমশিম খাচ্ছেন।
সালথার কৃষক আহম্মদ মাতুব্বর বলেন, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষে আগের তুলনায় অনেক বেশি খরচ হচ্ছে। এখন এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এক কেজি গরুর মাংসও কেনা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর পেঁয়াজ চাষ করবেন কি না, তা নিয়ে ভাবছেন।
পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমে গেছে। ফরিদপুর শহরের পাইকারি ব্যবসায়ী শাহজাহান বেপারি বলেন, এ বছর ফলন ভালো হওয়ায় এবং বিভিন্ন জেলা থেকে প্রচুর পেঁয়াজ আসায় বাজারে দাম কমেছে। তবে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগারের অভাব এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্রতিবছরই পেঁয়াজের দামে বড় ধরনের ওঠানামা হয়। এতে কখনও ভোক্তা, আবার কখনও কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েন।
সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১২ হাজার ৫৮৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। মোট উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন। তাঁর হিসাবে, প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকের গড়ে ২৪ টাকা এবং প্রতি মণে প্রায় ৯৬০ টাকা খরচ হয়। বাজারমূল্য নির্ধারণ কৃষি বিভাগের হাতে না থাকলেও কৃষকদের সংরক্ষণ বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দবির উদ্দিন বলেন, কৃষকরা ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কষ্টে আছেন। বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ের হলেও তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে লিখিতভাবে বিষয়টি তুলে ধরবেন, যাতে কৃষকদের স্বার্থে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া যায়।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণে কৃষকদের সহায়তা দিতে গত অর্থবছরে জেলায় ১ হাজার ৪৩০টি এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। চলতি বছর ইতোমধ্যে ৭০০টি বিতরণ করা হয়েছে এবং আরও প্রায় আড়াই হাজার মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, সরকারিভাবে পেঁয়াজ সংগ্রহ, আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ হারাবেন কৃষকরা।
মতামত দিন