Views Bangladesh Logo

ব্রেন টিউমারের ‘ভুল অস্ত্রোপচারে’ মৃত্যুর মুখে কৃষক মাহাবুব, অস্বীকার চিকিৎসকের

টিউমার অপসারণ করে সুস্থ জীবনে ফেরার স্বপ্ন দেখেছিলেন চকরিয়ার কৃষক মাহাবুবুর রহমান (৫০)। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসকের আশ্বাসে জমিজমা বিক্রি ও ধারদেনা করে ১৪ লাখ টাকা খরচ করেও মুক্তি মেলেনি রোগ থেকে। উল্টো ‘ভুল অস্ত্রোপচারের’ পর এখন তিনি শয্যাশায়ী, লড়ছেন মৃত্যুর সঙ্গে।

এই ঘটনায় চট্টগ্রামের এক নিউরো সার্জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই অভিযোগের তদন্তে নেমেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, চকরিয়ার লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের সিকলঘাট এলাকার বাসিন্দা মাহাবুবুর রহমান দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০২৫ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রাম পার্কভিউ হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে নিউরো সার্জন ডা. মো. ইসমাইল হোসেন তার ব্রেন টিউমার শনাক্ত করেন। চিকিৎসক জানান, সপ্তাহখানেকের মধ্যে অপারেশন না করলে মাহাবুবুর রহমান মারা যেতে পারেন।

এতে আতঙ্কিত হয়ে জমি বিক্রি করে ও আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করে ৮ লাখ টাকা জোগাড় করে তার পরিবার। ল্যাবএইড ও পার্কভিউ হাসপাতাল মিলিয়ে পরিবারটি ধাপে ধাপে প্রায় ১৪ লাখ টাকা খরচ করে। অপারেশনের পর ডা. ইসমাইল আশ্বাস দেন, অপারেশন সফল হয়েছে এবং রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন।

তবে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নেওয়ার পর মাহাবুবের অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকে। গত ২১ অক্টোবর তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চক্ষু চড়কগাছ হয় স্বজনদের। সেখানকার বিশেষজ্ঞ বোর্ড পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানায়, মাহাবুবের মস্তিষ্কের টিউমারটি আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে এবং তা আগের চেয়ে আরও বড় হয়েছে।

এই প্রতিবেদন নিয়ে ডা. ইসমাইল হোসেনের কাছে গেলে তিনি বাদীকে অপমান করে বের করে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে উন্নত চিকিৎসার জন্য আরও কয়েক লাখ টাকার প্রয়োজন হলেও নিঃস্ব পরিবারের পক্ষে তা জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে গত ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন মাহাবুবের ছেলে আরিফুল ইসলাম। মামলায় পার্কভিউ হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. ইসমাইল হোসেনকে আসামি করা হয়েছে। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মামলাটি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। অপারেশন ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে চিঠি দিয়ে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। বোর্ডের মতামত পাওয়ার পর পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে ডা. মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। রোগীর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই যতটুকু টিউমার অপসারণ করা সম্ভব ছিল, ততটুকুই করা হয়েছে। এর বেশি করলে জীবনের ঝুঁকি তৈরি হতো। বিষয়টি রোগীকে বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও তারা বুঝতে চাইছেন না। এটি আমার পেশাগত সুনাম ক্ষুণ্ণ করার অপচেষ্টা।’

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) বিধান অনুযায়ী, চিকিৎসায় অবহেলা প্রমাণ হলে লাইসেন্স বাতিলের বিধান থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ বিরল। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের রিপোর্টের ওপরই নির্ভর করছে কৃষক মাহাবুবুর রহমানের পরিবার ন্যায়বিচার পাবেন কি না।

বর্তমানে অর্থাভাবে ধুঁকতে থাকা মাহাবুবের পরিবারের একটাই আকুতি—ভুল চিকিৎসার বিচার এবং মাহাবুবের জীবন বাঁচানোর আকুল আবেদন।



মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ